এপ্রিল ১৭, ২০২৬ ৮:৫৯ অপরাহ্ণ

ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংলাপ প্রথম দফা আলোচনা শেষ, সমঝোতায় পৌঁছাতে লিখিত নথি বিনিময়

Facebook
Twitter
LinkedIn
WhatsApp
Print
ছবি: আল-জাজিরা

আন্তর্জাতিক নিউজ ডেস্ক,অমৃতালোক:

সড়ক খালি। কোনো যানবাহন নেই। নেই পথচারীর পদচারণাও। আকাশে হেলিকপ্টার ও নজরদারি ড্রোনের চক্রাকারে ঘোরাফেরা। প্রতিটি রাস্তার মোড়ে মোড়ে সাঁজোয়া যান, সেনাবাহিনীর সশস্ত্র টহল। কোনো কোনো এলাকায় অফিস-আদালত, ব্যবসা ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ, যেন কঠোর লকডাউন পরিস্থিতি।

এটি কোনো যুদ্ধাবস্থায় থাকা শহরের দৃশ্য নয়; বরং যুদ্ধ বন্ধের আয়োজন। শনিবার পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদে এমন নিরাপত্তার মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে ঐতিহাসিক সংলাপ অনুষ্ঠিত হয়েছে। এ দুই পক্ষের মধ্যস্থতায় বৈঠকে অংশ নেন পাকিস্তানের শীর্ষ প্রতিনিধিরাও। ১৯৭৯ সালে ইরানে ইসলামী বিপ্লবের পর দুই দেশের শীর্ষ কর্মকর্তাদের মধ্যে এটাই প্রথম মুখোমুখি আলোচনা। পাকিস্তানের রাষ্ট্র-নিয়ন্ত্রিত পিটিভি নিউজের বরাত দিয়ে দ্য ডন জানিয়েছে, ইসলামাবাদের সেরেনা হোটেলে এ ত্রিপক্ষীয় বৈঠক সরাসরি অনুষ্ঠিত হয়।

দুই দেশের মধ্যে শনিবার রাতে শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত দুই পর্বের আলোচনা শেষ হয়। আলজাজিরা জানায়, সমঝোতায় পৌঁছাতে আলোচনার এক পর্যায়ে দুই দেশ লিখিত নথি বিনিময় করে। যুদ্ধবিরতি চলাকালে দুই পক্ষের মধ্যে এ আলোচনা আরও চলবে বলে প্রাথমিকভাবে জানা গেছে। রাত দেড়টায় বার্তাসংস্থা এএফপি জানায়, প্রথম দফার তৃতীয় পর্বের আলোচনা (শনিবার) রাতেই হওয়ার কথা, নয়তো আজ রোববার হতে পারে। অবশ্য ইরানের সঙ্গে সংলাপের জন্য আজকের দিনটি পূর্বনির্ধারিত ছিল না।

বাংলাদেশ সময় শনিবার মধ্যরাতের পর ইরান সরকারের তরফ থেকে দেওয়া এক্স পোস্টে বলা হয়, ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে আলোচনা বিশেষজ্ঞ পর্যায়ে পৌঁছেছে। আলোচনায় অর্থনৈতিক, সামরিক, আইন ও পারমাণবিক বিশেষজ্ঞরা অংশ নিয়েছেন। সেরেনা হোটেলে আলোচনা চলছে। ইসলামাবাদ থেকে আল জাজিরার কিমবারলি হালকেট বলেন, আলোচনা অতীতের যে কোনো সময়ের চেয়ে গোপনীয়তার মধ্যে হচ্ছে। আলোচকরা কমপক্ষে ছয় ঘণ্টা মতবিনিময় করেছেন।

সূত্র জানায়, প্রথম দিন দুই পক্ষের দরকষাকষিতে হরমুজ ও লেবানন ইস্যুটি বেশি প্রধান্য পেয়েছে। বৈঠকের পর তাসনিম নিউজ এজেন্সি জানায়, হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে বড় মতানৈক্য হয়েছে। ইরান ওয়াশিংটনের দাবিকে অতিরঞ্জিত বলে বর্ণনা করেছে। তবে দুই পক্ষের মধ্যে আলোচনা অব্যাহত থাকবে।

‘ইসলামাবাদ সংলাপ’ নামে পরিচিত আলোচনায় যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধি দলের নেতৃত্বে ছিলেন দেশটির ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স। অন্যদিকে ইরানের পক্ষে প্রতিনিধি দলের নেতৃত্ব দেন দেশটির স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি। কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আলজাজিরা বলছে, পাকিস্তান, ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধিরা একই কক্ষে বসে আলোচনা করেছেন।

সংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাত দিয়ে আলজাজিরা জানায়, ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধিদের মধ্যে আলোচনা ইতিবাচক পরিবেশে অনুষ্ঠিত হয়েছে। সরাসরি আলোচনা প্রায় দুই ঘণ্টা চলার পর নৈশভোজের বিরতি দেওয়া হয়। পরে আবার আলোচনা শুরু হয়।

শুরুতে বলা হচ্ছিল, দুই দেশের প্রতিনিধিরা পরোক্ষভাবে আলোচনায় অংশ নেবেন। পরে পাকিস্তানি কর্মকর্তাদের উপস্থিতিতে সরাসরি আলোচনা শুরু হয়। এটিকে বড় অগ্রগতি হিসেবে দেখা হচ্ছে। সূত্র জানায়, আলোচনায় লেবাননে ইসরায়েলের অব্যাহত হামলা গুরুত্বের সঙ্গে তুলেছে ইরান। কিছু সূত্র ইঙ্গিত দেয়, (ইসরায়েলের) অভিযান এখন লেবাননের দক্ষিণে সীমাবদ্ধ থাকবে; বৈরুতে আর কোনো হামলা হবে না। ইরানের সূত্র অনুযায়ী, দেশটির সম্পদ ছাড় হতে যাচ্ছে, এমন কিছু পরিবর্তনও হয়েছে।

এর আগে পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসহাক দার ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মোহসিন নাকভি বিমানবন্দরে গিয়ে দুই দেশের প্রতিনিধি দলকে স্বাগত জানান। সঙ্গে ছিলেন দেশটির সেনাপ্রধান আসিম মুনিরও। প্রথমে ইরানের প্রতিনিধি দল পৌঁছালে মন্ত্রীদের সঙ্গে সামরিক পোশাকে স্বাগত জানান মুনির। কয়েক ঘণ্টা পর মার্কিন প্রতিনিধিরা এলে তিনি স্যুট-কোট পরে তাদের স্বাগত জানিয়েছেন।

সংলাপ শুরুর আগে দুই পক্ষের প্রতিনিধিরা আয়োজক দেশ পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফের সঙ্গে পৃথক বৈঠক করেন। শাহবাজের সঙ্গে জেডি ভ্যান্স যে বৈঠক করেছেন, সেখানে যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ ও প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জামাতা জেরাড কুশনারও ছিলেন। এর আগে ইরানের সঙ্গে যত ব্যর্থ আলোচনা হয়েছিল, সবকটিতে উইটকফ ও কুশনারকে দেখা গেলেও এই প্রথম দৃশ্যপটে এলেন জেডি ভ্যান্স। আল জাজিরা জানায়, বৈঠকে উইটকফ ও কুশনারের উপস্থিতির কঠোর সমালোচনা করেছেন মার্কিন ডেমোক্র্যাট দলের নেতারা। তারা এ দুজনের কূটনৈতিক সামর্থ্য নিয়ে প্রশ্ন তুলেন।

পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে জানানো হয়, ভ্যান্সের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে পাকিস্তানের পক্ষে আরও উপস্থিত ছিলেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসহাক দার ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মোহসিন নাকভি; ছিলেন উইটকফ ও কুশনারও। পরে ইরানের প্রতিনিধিদের সঙ্গে পৃথক বৈঠক করেন শাহবাজ। তবে এক বিবৃতিতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের বৈঠক প্রসঙ্গে শাহবাজ শরিফ বলেন, এ আলোচনা মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘস্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠার পথে একটি বড় ধাপ হিসেবে কাজ করবে। সেই সঙ্গে দুই পক্ষকে সম্ভাব্য সব ধরনের সহযোগিতা দিতে পাকিস্তানের অঙ্গীকারের কথা তিনি পুনর্ব্যক্ত করেন।

৪০ দিনের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের পর পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে যুদ্ধবিরতির মধ্যে এ আলোচনা চলছে। তবে এসবের মধ্যেই যুদ্ধবিরতির শর্ত লঙ্ঘন করে লেবাননে হামলা চালিয়ে যাচ্ছে ইসরায়েল।

ঐতিহাসিক এ আলোচনাকে কেন্দ্র করে কার্যত দুর্গে পরিণত হওয়া ইসলামাবাদে সংবাদ সংগ্রহে উপস্থিত হন বিশ্বের প্রধান প্রধান গণমাধ্যমের অর্ধশতাধিক সাংবাদিক। শনিবার লেবাননে অন্তত ২০০টি লক্ষ্যে হামলা চালিয়েছে ইসরায়েল। এতে তিনজন নিহত ও কয়েকজন আহত হয়েছেন। প্রশ্ন উঠছে, দুই পক্ষের এ আলোচনা কি সাফল্যের মুখ দেখবে? সেন্টার ফর মিডল ইস্ট স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজের সিনিয়র রিসার্চ ফেলো আবাস আসলানি বলেন, বর্তমান আলোচনা ‘কোনো চূড়ান্ত পরিণতির জন্য নয়, বরং একটি প্রক্রিয়ার সূচনা।’ তিনি বলেন, ‘কয়েক দিন আগে যখন আমরা যুদ্ধবিরতি চুক্তির কথা শুনছিলাম, তখন কেউ কেউ ভেবেছিলেন– এটি একটি চূড়ান্ত চুক্তি। কিন্তু গত কয়েক দিনের ঘটনাপ্রবাহ ইঙ্গিত দিচ্ছে– এটি একটি বন্ধুর পথ, তবে অবরুদ্ধ নয়।’

আলোচনাকে সমর্থন জানিয়েছে রাশিয়া। দেশটি ইসলামাবাদে আলোচনায় অংশগ্রহণকারীদের প্রতি ‘এই সুযোগকে বিপন্ন করতে পারে– এমন যে কোনো পদক্ষেপ থেকে বিরত থাকা’র আহ্বান জানিয়েছে। রুশ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে বলেছে, ‘আমরা পাকিস্তানে অনুষ্ঠিতব্য আলোচনায় সব অংশগ্রহণকারীকে দায়িত্বশীল আচরণ করতে এবং এ সুযোগকে বিপন্ন করতে পারে, এমন যে কোনো পদক্ষেপ থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানাচ্ছি।’

দ্য গার্ডিয়ান জানিয়েছে, মধ্যপ্রাচ্য পরিস্থিতি নিয়ে শনিবার ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাখোঁ ও তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তায়েপ এরদোয়ান ফোনে কথা বলেছেন। তারা যুদ্ধবিরতিতে লেবাননকে অন্তর্ভুক্ত করার কথা বলেন। সূত্র জানায়, ইসরায়েলের সঙ্গে সরাসরি আলোচনা নিয়ে লেবাননে বিভক্তি রয়েছে। এক পক্ষ এ আলোচনা চাইলেও আস্থা রাখতে পারছে না আরেকটি।

শনিবার আল জাজিরা জানায়, ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু বলেছেন– তার নেতৃত্বে ইসরায়েল ইরান ও এর সমর্থিত সংগঠনগুলোর বিরুদ্ধে লড়াই করে যাবে। এক এক্স পোস্টে নেতানিয়াহু বলেন, ইরানের বিরুদ্ধে ইসরায়েলের সামরিক অভিযান শেষ হয়নি, যদিও ইসরায়েল এ পর্যন্ত ‘ঐতিহাসিক অর্জন’ পেয়েছে। তিনি লিখেন, ‘আমরা তাদের আঘাত করবো, আমাদের আরও অনেক কিছু করার আছে।’

যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি ‘পুরোপুরি অবিশ্বাস’ নিয়ে ইরান আলোচনায় বসছে বলে জানিয়েছেন দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি। ইরানের মেহের নিউজ এজেন্সি জানিয়েছে, জার্মানির পররাষ্ট্রমন্ত্রী জোহান ওয়েডফুলের সঙ্গে আলাপকালে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ মন্তব্য করেন। আরাঘচি বলেন, ইরান তার দেশের জনগণের স্বার্থ ও অধিকার রক্ষায় পুরো শক্তি দিয়ে লড়বে। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনায় বসার আগে তিনি ওয়াশিংটনের অতীতের নানা কর্মকাণ্ডকে ‘প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ’ ও ‘কূটনৈতিক বিশ্বাসঘাতকতা’ হিসেবে আখ্যায়িত করেন।

এ বৈঠককে কেন্দ্র করে ইরানের প্রথম ভাইস প্রেসিডেন্ট বলেছেন, ইসলামাবাদে অনুষ্ঠিতব্য এ গুরুত্বপূর্ণ আলোচনার ফলাফল সম্পূর্ণরূপে যুক্তরাষ্ট্রের অগ্রাধিকারের ওপর নির্ভর করছে। মোহাম্মদ রেজা আরেফ এক্স-এ পোস্ট করেন, মার্কিন প্রতিনিধিরা যদি তাদের ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ স্বার্থের ওপর মনোযোগ দেন, তবে একটি পারস্পরিক লাভজনক চুক্তি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তিনি ‘ইসরায়েল ফার্স্ট’ নীতির দিকে যে কোনো ধরনের পরিবর্তনের বিরুদ্ধে সতর্ক করেছেন।

আরেফ বলেন, ফলে একটি ‘চুক্তিবিহীন’ পরিস্থিতি তৈরি হবে এবং ইরান ‘অনিবার্যভাবে আগের চেয়ে আরও জোরালোভাবে আমাদের প্রতিরক্ষা চালিয়ে যাবে।’ তিনি সতর্ক করে বলেন, এ পরিস্থিতি বিশ্বের ওপর ‘বৃহত্তর মূল্য’ চাপিয়ে দেবে।

প্রতিরক্ষা চুক্তির অধীনে সৌদি আরবে যুদ্ধবিমান পাঠিয়েছে পাকিস্তান
বার্তা সংস্থা রয়টার্স জানায়, শনিবার সৌদি প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, দুই দেশের মধ্যে স্বাক্ষরিত প্রতিরক্ষা চুক্তির অধীনে নিরাপত্তা জোরদার করতে পাকিস্তান সৌদি আরবে যুদ্ধবিমান ও অন্যান্য সামরিক বাহিনী পাঠিয়েছে।

এক বিবৃতিতে মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, পাকিস্তানের যুদ্ধবিমান ও সহায়ক বিমানগুলো দেশটির পূর্বাঞ্চলীয় প্রদেশের কিং আবদুল আজিজ বিমানঘাঁটিতে পৌঁছেছে। এতে বলা হয়, পাকিস্তানের এ মোতায়েনের লক্ষ্য হলো, যৌথ প্রতিরক্ষা সহযোগিতা জোরদার এবং আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা, স্থিতিশীলতাকে সমর্থন করা।

কোনো মার্কিন জাহাজ হরমুজ প্রণালি অতিক্রম করেনি বলে জানিয়েছে ইরান। ইরানের সংবাদমাধ্যম আইআরআইবি দেশটির একজন জ্যেষ্ঠ সামরিক কর্মকর্তার বরাত দিয়ে এ কথা জানিয়েছে।

এর আগে মার্কিন সংবাদমাধ্যম অ্যাক্সিয়স জানায়, বেশ কয়েকটি মার্কিন জাহাজ হরমুজ প্রণালি অতিক্রম করেছে। আর মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ট্রুথ সোশ্যালে দাবি করেন, তারা হরমুজে মাইন অপসারণ প্রক্রিয়া শুরু করেছে।

নিউজটি ‍শেয়ার করতে নিচের বাটনগুলোতে চাপ দিন

আরো খবর

বিভাগীয় সংবাদ