নিজস্ব প্রতিবেদক, অমৃতালোক:
রিয়াদ হাসান ও শাহনাজের (উভয়েরই ছদ্মনাম) পাঁচ বছরের প্রেমের পরিণতিতে ২০১৭ সালের জুনে পারিবারিকভাবে বিয়ে হয়। পুরান ঢাকায় সংসার শুরু করেন তাঁরা।
রিয়াদ ব্যবসায়ী। শাহনাজ ঘরকন্না সামলান। ২০২১ সালে একটি কন্যাসন্তানের জন্ম হয় তাঁদের। তবে তত দিনে দুজনের মধ্যে বোঝাপড়ায় সমস্যা দেখা দিয়েছে।
রিয়াদকে সন্দেহ করতে শুরু করেন শাহনাজ। রিয়াদও কেমন যেন দূরে দূরে থাকেন। এভাবে মানসিক দূরত্ব তৈরি হয়ে যায় দুজনের মধ্যে। ঘটে সম্পর্কের অবনতি।
খিটিমিটি, ঝগড়া এক পর্যায়ে বিচ্ছেদের দিকে গড়ায়। ২০২৫ সালে অবসান ঘটে দুজনের আট বছরের দাম্পত্যজীবনের।
শ্লেষণ করে দেখা গেছে, অন্তত ১২টি কারণে বিচ্ছেদের ঘটনা ঘটছে। এর মধ্যে রয়েছে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন, যৌতুকের চাপ, ভরণপোষণ না দেওয়া, স্বামী বা স্ত্রীর বিবাহবহির্ভূত সম্পর্ক, মাদকাসক্তি, সন্দেহপ্রবণতা, অর্থনৈতিক চাপ, প্রবাসী স্বামীর সঙ্গে দীর্ঘ বিচ্ছিন্নতা, পারিবারিক হস্তক্ষেপ, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অতিরিক্ত আসক্তি, একে অন্যকে সময় না দেওয়া, যোগাযোগের ঘাটতি এবং পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধের অভাব ও ‘বিকল্প জীবনের’ আকাঙ্ক্ষা বিচ্ছেদের কারণ হচ্ছে। এসব বিষয় নারী ও পুরুষ উভয় পক্ষ থেকে সংসার ভাঙনের পেছনে কাজ করছে।
নারীরা কেন বেশি বিচ্ছেদের আবেদন করছেন : অপরাধ ও মনো বিশেষজ্ঞদের মতে, নারীদের শিক্ষা ও অর্থনৈতিক সক্ষমতা বৃদ্ধি এর অন্যতম কারণ। আগে অনেক নারী নির্যাতন, অবহেলা বা অসুখী দাম্পত্য জীবন থেকে বেরিয়ে আসতে চাইলেও অর্থনৈতিক ও সামাজিক নির্ভরতার কারণে সিদ্ধান্ত নিতে পারতেন না। এখন পরিস্থিতি বদলেছে। মনোবিজ্ঞানীদের মতে, নারীর অর্থনৈতিক স্বাধীনতা বাড়ার পাশাপাশি নিজের অধিকার সম্পর্কে সচেতনতাও বেড়েছে। ফলে দীর্ঘদিনের নির্যাতন বা অসম্মান মেনে নিয়ে সংসার চালিয়ে যাওয়ার প্রবণতা কমছে।
তবে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন, নারীর অধিকার সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধিই তালাকের নেতিবাচক কারণ নয়। বরং কোনো নারী নির্যাতন থেকে মুক্তির জন্য বিচ্ছেদের সিদ্ধান্ত নিলে সেটিকে সামাজিক পরিবর্তনের অংশ হিসেবেও দেখতে হবে। কারণ অনেক নারী স্বেচ্ছায় নয়, বরং দীর্ঘদিনের শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন, অপমান ও অবহেলার শিকার হয়ে বিচ্ছেদের সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হন।
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ও বিবাহবহির্ভূত সম্পর্কের প্রভাব : সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের ব্যাপক ব্যবহার দাম্পত্য সম্পর্কের ওপরও প্রভাব ফেলছে। ফেসবুক, মেসেঞ্জারসহ বিভিন্ন মাধ্যমে নতুন সম্পর্ক তৈরি, পুরনো সম্পর্ক পুনরুজ্জীবিত হওয়া কিংবা স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে সন্দেহ তৈরি হওয়ার ঘটনাও এখন বিচ্ছেদের কারণ হয়ে উঠছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বিবাহবহির্ভূত সম্পর্ক। অনেক ক্ষেত্রে আবেদনে সরাসরি ‘বিবাহবহির্ভূত সম্পর্ক’ লেখা না হলেও ‘মনের অমিল’, ‘মানসিক নির্যাতন’ বা ‘দাম্পত্য কলহ’ হিসেবে কারণ উল্লেখ করা হয়।
মাদকেও ভাঙছে সংসার : দাম্পত্য বিচ্ছেদের নেপথ্যে মাদকাসক্তির বিষয়টিও উঠে আসছে। মাদক সেবনের পর নির্যাতন, পরিবারের প্রতি দায়িত্বহীনতা, অর্থ নষ্ট করা এবং সন্দেহ-অবিশ্বাসের কারণে অনেক দাম্পত্য সম্পর্কে চরম সংকট তৈরি হচ্ছে। তালাকের আবেদনে মাদকাসক্তিকে কারণ হিসেবে উল্লেখ করার ঘটনাও রয়েছে।
সবচেয়ে বড় ক্ষতি সন্তানের : দাম্পত্য বিচ্ছেদের সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়ে সন্তানদের ওপর। মা-বাবার সম্পর্ক ভেঙে যাওয়ার পর তাদের মানসিক নিরাপত্তা, পড়াশোনা, সামাজিক সম্পর্ক এবং ভবিষ্যৎ পারিবারিক জীবন সম্পর্কে ধারণায় নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু সন্তান কিংবা সামাজিক চাপের কারণে নির্যাতনমূলক সম্পর্ক টিকিয়ে রাখাও সমাধান নয়। বরং সম্পর্ক ভাঙনের আগেই দাম্পত্য কাউন্সেলিং, পারিবারিক সহায়তা এবং প্রয়োজন হলে আইনগত সহায়তার সুযোগ বাড়ানো জরুরি।
সমাজ বিশ্লেষকদের মতে, রাজধানীতে বাড়তে থাকা তালাক তাই কেবল সংসার ভাঙার পরিসংখ্যান নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে নগরজীবনের চাপ, অর্থনৈতিক স্বাধীনতা, নারীর অধিকার সচেতনতা, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম, মাদক, পরকীয়া, পারিবারিক মূল্যবোধের পরিবর্তন এবং স্বামী-স্ত্রীর পারস্পরিক সহনশীলতার সংকট।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ও সমাজ-অপরাধ বিশ্লেষক ড. তৌহিদুল হক বলেন, রাজধানীতে উচ্চশিক্ষিত ও কর্মজীবী মানুষের সংখ্যা বেশি হলেও এটিকে সরাসরি বিবাহবিচ্ছেদের কারণ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। বরং দাম্পত্য সম্পর্কে পারস্পরিক সহনশীলতা, ধৈর্য এবং আলোচনার মাধ্যমে যৌথ সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর প্রবণতা কমে যাওয়াই বড় সংকট।








