অক্টোবর ১২, ২০২৬ ৫:২২ পূর্বাহ্ণ

গ্রামাঞ্চলে ব্যাপক হারে বাড়ছে ডেঙ্গু রোগী

Facebook
Twitter
LinkedIn
WhatsApp
Print

নিজস্ব প্রতিবেদক, অমৃতালোক:

ডেঙ্গু জ্বর এক সময় রাজধানী কেন্দ্রিক থাকলেও এখন তা গ্রামে গ্রামে ছড়িয়ে পড়েছে। ফলে গ্রামে ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা বাড়ছে ব্যাপক হারে। শুরুতে ঢাকার বাইরে বিভাগীয় শহর পর্যন্ত এডিস মশার বংশ বিস্তার হওয়ায় ঐসব শহরে ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা বাড়তে থাকে। এরপর জেলা ও উপজেলায় এডিস মশার বিস্তার হয় এবং বর্তমানে তা গ্রাম পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়েছে। চিকিৎসক, জনস্বাস্থ্যবিদ ও কীটতত্ত্ববিদরা বলছেন, বর্তমানে গ্রামেই ডেঙ্গুজ্বরে আক্রান্তের হার বেশি। তাদের আশংকা, এ অবস্থা চলতে থাকলে সামনে গ্রামাঞ্চলে ডেঙ্গু মহামারি আকার ধারণ করবে।

রাজধানীর ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল, শিশু হাসপাতাল, মুগদা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল, সোহরাওয়ার্দী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালসহ সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালে আগত ডেঙ্গু রোগীর মধ্যে গ্রামাঞ্চলে আক্রান্তের সংখ্যাই বেশি বলে জানিয়েছেন হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ও চিকিৎসকরা। তারা আরও জানান, আক্রান্তদের মধ্যে শিশুদের সংখ্যাই বেশি। আবার এদের মধ্যে বেশিরভাগেরই অবস্থা গুরুতর। এই শিশুদের আইসিইউ সাপোর্ট ছাড়া সুস্থ হওয়ার সম্ভাবনা নেই। সময়মতো আইসিইউ না পাওয়া শিশু কিংবা অন্যান্য বয়সের ডেঙ্গু আক্রান্তরা মারা যাচ্ছে। শিশুদের মৃত্যুর হার বাড়ছে বলে চিকিৎসকরা জানিয়েছেন।

চিকিৎসক ও বিশেষজ্ঞরা এই পরিস্থিতি সৃষ্টির জন্য দেশের সর্বত্র এডিস মশার বংশ বিস্তার রোধে জনবল, যন্ত্রপাতি ও অন্যান্য ব্যবস্থাপনার অপর্যাপ্ততা, নীরব ঘাতক ডেঙ্গু সম্পর্কে সাধারণ মানুষের অসচেতনতা এবং গুরুতর ডেঙ্গু রোগীর চিকিৎসায় আইসিইউর স্বল্পতাকে দায়ী করেছেন।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, রাজধানীসহ ঢাকার বাইরে সিটি কর্পোরেশন এলাকায় এডিস মশার বংশ বিস্তার রোধে জনবল, যন্ত্রপাতি ও অন্যান্য ব্যবস্থাপনা রয়েছে। জেলা শহর ও উপজেলা পর্যায় এডিস মশার বংশ বিস্তার রোধে তেমন কোনো জনবল ও ব্যবস্থাপনা নেই। কোনো কোনো জেলা শহরে থাকলেও তা সীমিত পরিসরে রয়েছে। ডেঙ্গু আক্রান্তের ব্যাপকতার কারণে কোনো কোনো জেলায় মশক নিধন কার্যক্রম শুরু করেছে। গ্রামাঞ্চলে ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানের অফিস ছাড়া মশক নিধনের অন্য কোনো ব্যবস্থাপনা নেই।

ডেঙ্গু সম্পর্কে সাধারণ মানুষের অসচেনতার কারণে এই রোগে মৃত্যুর সংখ্যা বাড়ছে বলে জানিয়েছেন চিকিৎসকরা। এ বিষয়ে চিকিত্সকদের পর্যবেক্ষণ ভয়াবহ। চিকিত্সক ও বিশেষজ্ঞরা এই প্রতিবেদককে জানিয়েছেন, গ্রামাঞ্চলের পিতামাতারা ডেঙ্গুজ্বর ও অন্যান্য জ্বরের চিকিৎসা ব্যবস্থাপনার মধ্যে পার্থক্য জানেন না। তাই শিশু সন্তানের জ্বর হলে দোকান থেকে প্যারাসিটামল কিংবা অন্য কোনো ট্যাবলেট নিজেরাই কিনে এনে খাওয়ান। ২-১ দিন পর জ্বর ছেড়ে গেলে মনে করেন ছেলে সুস্থ হয়ে গেছে। ২-১ দিন পর আবার সন্তানের শরীরে এই জ্বর শুরু হয়। ডেঙ্গু জ্বর নীরব ঘাতকের মতো এটা গ্রামাঞ্চলের সিংহভাগ পিতামাতা কিংবা অভিভাবকরা জানেন না। পিতামাতা ও অভিভাবকদের চোখের সামনে সন্তান নিস্তেজ হয়ে যাচ্ছে। এই অবস্থায় অসুস্থ সন্তান নিয়ে ঢাকায় রওয়ানা হন তারা। পথেই অনেকের মৃত্যু হয়। হাসপাতালের জরুরি বিভাগে নিয়ে আসলে চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন। পিতামাতার সামনে সন্তান মারা যাচ্ছে তারা বুঝতেও পারছেন না। আবার কোনো ডেঙ্গু রোগীকে আইসিইউতে সাপোর্টের জন্য জরুরি বিভাগ থেকে চিকিৎসকরা রেফার্ড করেন। কিন্তু আইসিইউতে খালি শয্যা পাওয়া যায় না। সময়মতো আইসিইউ সাপোর্ট না পেয়ে মারা যাচ্ছে রোগী। ডেঙ্গু রোগীদের চাহিদার তুলনায় আইসিইউ ব্যবস্থাপনা সীমিত। ফলে ডেঙ্গু রোগীদের তাৎক্ষণিক লাইফ সাপোর্ট পাওয়া ভাগ্যের ব্যাপার হয়ে দাঁড়াচ্ছে।

ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল পরিচালক বিগ্রেডিয়ার জেনারেল এ কে এম ফরহাদ জানান, ডেঙ্গু রোগীদের চিকিৎসা ব্যবস্থাপনা সম্প্রসারণসহ যা করণীয় ব্যবস্থা সবই করা হয়েছে। অতিরিক্ত শয্যা প্রস্তুত রাখা হয়েছে। রোগীদের বহনকারী অ্যাম্বুলেন্সের পথ সুগম করতে জরুরি বিভাগের সামনে অপেক্ষমাণ প্রাইভেট অ্যাম্বুলেন্সের জট সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। আন্ডারগ্রাউন্ডে মোটরসাইকেল রাখা বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। রোগীদের জরুরি বিভাগে আসা-যাওয়ায় কোনো ধরনের বিলম্ব নেই। দ্রুত চিকিৎসা সেবা নিশ্চিত করা এবং পরিবেশ উন্নত হয়েছে বলে তিনি জানান।

শিশু হাসপাতালের জরুরি বিভাগে গিয়ে দেখা যায়, একের পর এক ডেঙ্গু রোগী বহনকারী অ্যাম্বুলেন্স আসছে। অ্যাম্বুলেন্সের লাইন লেগে যাচ্ছে। চিকিৎসক, নার্স ও কর্মচারীরা আগত রোগীর চিকিৎসা সেবা নিশ্চিত করতে ব্যতিব্যস্ত। একজন সিনিয়র অধ্যাপক এই প্রতিনিধিকে জানান, ফোন আসলে অপর প্রান্তের আবেদন ‘আমার সন্তানের আইসিইউ লাগবে। একটু ব্যবস্থা করে দেন।’ সারাক্ষণই আত্মীয়-স্বজন, শুভাকাঙ্ক্ষী ও পরিচিত লোকজন আইসিইউর জন্য ফোন করে থাকেন। কিন্তু আইসিইউতে বেড খালি থাকে না। কোনো সাহায্য করতে না পারায় বেশির ভাগ ফোন রিসিভ করেন না বলে জানান তিনি।

জনস্বাস্থ্যবিদ ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সাবেক পরিচালক ডা. বেনজীর আহমেদ বলেন, ‘২০১৯ সাল থেকে ঢাকার বাইরে এডিস বংশ বিস্তার ব্যাপক শনাক্ত করা হয়। ক্রমাগত গ্রামাঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ছে। বরগুনা, পিরোজপুর, রাজশাহী ও চাঁপাইনবাবগঞ্জ ডেঙ্গুর বংশ বিস্তারের পাশাপাশি ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত সংখ্যা বাড়তে থাকে। এ বছর গ্রামাঞ্চলে ব্যাপক হারে দেখা দিচ্ছে। ঢাকায় মশক নিয়ন্ত্রণে সক্ষমতা রয়েছে। ঢাকার বাইরে সেই ধরনের ঘাটতি অনেক। গ্রামাঞ্চলে নেই মশক নিধন কার্যক্রমে ব্যবস্থা। সরকারের পক্ষে একা সম্ভব নয় ডেঙ্গু প্রতিরোধ নিয়ন্ত্রণ করা। মশক নিধন কার্যক্রম ও প্রতিরোধে জাতীয় পর্যায় কর্মশালা, প্রশিক্ষণ ও যন্ত্রপাতি ক্রয়সহ সমন্বিত কার্যকরী উদ্যোগ নিতে হবে।’ সকল পেশার লোকজনসহ স্থানীয় প্রতিনিধি, শিক্ষক, স্কুল ও কলেজ ছাত্রছাত্রীসহ সকল পেশার লোকজন মশক নিধন কার্যক্রমে অংশগ্রহণে সম্পৃক্ত করতে হবে। অন্যথায় দেশব্যাপী ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে বাইরে চলে যাবে বলে তিনি অভিমত ব্যক্ত করেন।

মহাখালী জাতীয় প্রতিষেধক ও সামাজিক চিকিৎসা প্রতিষ্ঠানের কীটতত্ত্ব বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক ড. মো. গোলাম ছারোয়ার বলেন, ‘শহরের পাশাপাশি গ্রামাঞ্চলে ব্যাপক হারে এডিস মশা নিধন কার্যকরী পদক্ষেপ নিতে হবে। গ্রামাঞ্চলে কচুপাতা, তাল গাছে পাতাসহ যে কোনো স্থানে ফেলা ভাঙা কলস, টায়ার, প্লাস্টিক ভাঙা অংশে সহজে এডিস মশা বংশ বিস্তার করছে। বৃষ্টি হলে গ্রামাঞ্চলের খোলা জায়গায় স্বচ্ছ পানি যেখানে সেখানে থাকে। গ্রামাঞ্চলে এডিস মশা ঢুকে পড়েছে এবং বংশ বিস্তার শুরু করেছে। পর্যায়ক্রমে ব্যাপক ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত হতে থাকবে।’ সচেতনতার অভাবে গ্রামাঞ্চলে ডেঙ্গু জ্বরে ব্যাপকহারে বৃদ্ধির আশংকা করছেন তিনি। সময় থাকতে দেশব্যাপী মশক কার্যক্রম এখন ব্যাপকভাবে শুরু করার পরামর্শ দিয়েছেন এই কীটতত্ত্ববিদ।

ঢাকা শিশু হাসপাতালের অধ্যাপক ডা. সফি আহমেদ মোয়াজ জানান, ডেঙ্গু জ্বরের পাশাপাশি ভাইরাল জ্বরসহ অন্যান্য জ্বর শুরু হয়েছে। জ্বরে আক্রান্ত হওয়ার ২৪ ঘণ্টা পরই ডেঙ্গু পরীক্ষা করার পরামর্শ দিয়েছেন তিনি। শিশুরাই ডেঙ্গুর পাশাপাশি ভাইরাল জ্বরে আক্রান্ত হচ্ছে বলেও তিনি জানান।

নিউজটি ‍শেয়ার করতে নিচের বাটনগুলোতে চাপ দিন

আরো খবর

বিভাগীয় সংবাদ