এপ্রিল ২৪, ২০২৬ ৪:০৯ অপরাহ্ণ

জ্বালানি তেলের দাম বাড়ায় চাপে ভোক্তারা – বেড়েছে চালসহ সব নিত্যপণ্যের দাম

Facebook
Twitter
LinkedIn
WhatsApp
Print

নিজস্ব প্রতিবেদক,অমৃতালোক :
এক সপ্তাহের ব্যবধানে এক ডজন ডিমের দাম ১৫ টাকা বেড়েছে। সাধারণ মাঝারি মানের চাল (পাইজাম) প্রতি কেজিতে ৫ টাকা বেড়েছে। শুধু এ দুটি পণ্যই নয়, আটা, ময়দা, তেল, ডাল থেকে শুরু করে সবজি সবকিছুর দামই বেড়েছে।

আজ রাজধানীর কাওরান বাজার, শান্তিনগর ও তুরাগ এলাকার নতুন বাজারে খোঁজ নিয়ে বিভিন্ন পণ্যের দামের এ চিত্র দেখা যায়। জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির পর দেশের নিত্যপণ্যের বাজারে নতুন করে চাপ তৈরি হয়েছে। এতে বিপাকে পড়েছেন ভোক্তারা। কারণ, আয় না বাড়ায় এই বাড়তি ব্যয়ের চাপ সরাসরি তাদের ওপর পড়ছে। ফলে প্রতিদিনের হিসাব মেলানোই এখন তাদের বড় চ্যালেঞ্জ।

উল্লেখ্য, গত ১৮ এপ্রিল প্রতি লিটার ডিজেলের দাম ১০০ থেকে বাড়িয়ে ১১৫ টাকা, কেরোসিন ১১২ থেকে বাড়িয়ে ১৩০ টাকা, অকটেন ১২০ থেকে বাড়িয়ে ১৪০ টাকা এবং পেট্রোলের দাম ১১৬ থেকে বাড়িয়ে ১৩৫ টাকা নির্ধারণ করেছে সরকার। এছাড়া, চলতি মাসেই মাসেই দ্বিতীয় বারের মতো ভোক্তাপর্যায়ে বেসরকারি খাতের তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাসের (এলপিজি) দাম বাড়ানো হয়েছে। বাজার সংশ্লিষ্টরা জানান, জ্বালানির দাম বাড়ার পর প্রথম ধাক্কা লাগে পরিবহন খাতে। সরকারিভাবে ভাড়া পুনর্নির্ধারণের সিদ্ধান্তের আগেই বিভিন্ন অঞ্চলে ট্রাক ভাড়া এক লাফে ১০ থেকে ১৫ হাজার টাকা পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে। এর প্রভাব পড়েছে নিত্যপণ্যের পাইকারি বাজারে। পাইকারি দামের এই পরিবর্তন ধীরে ধীরে ভোক্তা পর্যায়ে পৌঁছাতে শুরু করেছে। অর্থনীতিবিদরা বলেছেন, জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি অর্থনীতিতে একটি ‘চেইন প্রভাব’ সৃষ্টি করে। এর ফলে উত্পাদন, পরিবহন ও সরবরাহ ব্যবস্থার প্রতিটি ধাপে খরচ বাড়ে, যা শেষ পর্যন্ত মূল্যস্ফীতির ওপর চাপ তৈরি করে। তারা সতর্ক করে বলেন, জ্বালানি খরচ দীর্ঘ সময় উচ্চ অবস্থানে থাকলে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় আরো বেড়ে যেতে পারে।

চালের দামে উল্লম্ফন :গতকাল বাজারে গিয়ে দেখা যায়, মাঝারি মানের চাল (পাইজাম/লতা) গত তিন দিনের ব্যবধানে প্রতি কেজিতে দুই থেকে পাঁচ টাকা বেড়েছে। তিন দিন আগেও যে চাল ৫৫ থেকে ৬৮ টাকায় বিক্রি হয়েছে, তা এখন ৬০ থেকে ৭০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। আটা ও ময়দার দামও প্রতি কেজিতে দুই থেকে পাঁচ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। গতকাল বাজারে প্রতি কেজি খোলা আটা (সাদা) ৪২ থেকে ৪৬ টাকা, প্যাকেট আটা ৫৫ থেকে ৬০ টাকা এবং খোলা ময়দা ৫৫ থেকে ৬০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। যা তিন দিন আগে যথাক্রমে ৪০ থেকে ৪৫ টাকা, ৫০ থেকে ৬০ টাকা এবং ৫০ থেকে ৬০ টাকায় বিক্রি হয়েছে। বেড়েছে খোলা সয়াবিন তেলের দামও। প্রতি লিটারে পাঁচ টাকা বেড়ে গতকাল তা ১৮৫ থেকে ১৯৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। গত তিন-চার দিনের ব্যবধানে দাম বেড়েছে এমন পণ্যের তালিকায় আরো রয়েছে ছোলা, ডিম ও সবজি। গতকাল বাজারে প্রতি কেজি ছোলা বিক্রি হয়েছে ৯০ থেকে ১০০ টাকায়, যা আগের দিন ৮০ থেকে ৯৫ টাকায় বিক্রি হয়েছে। ফার্মের ডিমের দাম বেড়েছে সবচেয়ে বেশি। এক সপ্তাহ আগেও প্রতি ডজন বাদামি ডিম ১২০ টাকায় বিক্রি হয়েছে, যা গতকাল ১৩৫ টাকায় বিক্রি হতে দেখা গেছে।

সরকারের বিপণন সংস্থা ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশ (টিসিবি) প্রতিদিন নিত্যপণ্যের বাজারদর নিয়ে প্রতিবেদন তৈরি করে। সংস্থাটির এই প্রতিবেদনেও পণ্যগুলোর দাম বাড়ার তথ্য উঠে এসেছে। বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির গত মঙ্গলবার সচিবালয়ে সাংবাদিকদের বলেছেন, বৈশ্বিক পরিস্থিতি, বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের কারণে জ্বালানি ও পণ্যের সরবরাহ ব্যবস্থায় চাপ তৈরি হয়েছে। সরকার বিষয়টি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। এদিন দ্রব্যমূল্য ও বাজার পরিস্থিতি পর্যালোচনা বিষয়ক টাস্কফোর্স কমিটির বৈঠক শেষে তিনি বলেন, বাজারে কোনো ধরনের কৃত্রিমসংকট বা কারসাজি বরদাশত করা হবে না।

বেশির ভাগ সবজি ৭০ টাকার ওপরে :জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধিতে পরিবহন খরচ বাড়ায় সবজির দামেও নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। বেশির ভাগ সবজির কেজি ৭০ টাকার ওপরে। এর মধ্যে প্রতি কেজি বেগুন ৮০ থেকে ১২০ টাকা, ঝিঙা ৭০ থেকে ৮০ টাকা, পটল ৮০ টাকা, করলা ৭০ থেকে ৮০ টাকা, বরবটি ৮০ টাকা এবং কচুমুখী ৯০ থেকে ১০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।

বেচাকেনায় ভাটা :এদিকে নিত্যপণ্যের দাম বাড়ায় আগের তুলনায় বিক্রি কমেছে বলে জানিয়েছেন বিক্রেতারা। তুরাগ এলাকার নতুন বাজারের একটি ডিপার্টমেন্টাল স্টোরের স্বত্বাধিকারী সাদ্দাম হোসেন বলেন, জিনিসপত্রের দাম বাড়ায় গত কয়েক দিনের ব্যবধানে বেচাকেনায় ভাটা পড়েছে। ক্রেতাদের আনাগোনা আগের তুলনায় কমেছে। গতকাল এই বাজারে কেনাকাটা করতে আসা ফরহাদ হোসেন বলেন, এক সপ্তাহ আগেও এক ডজন ফার্মের বাদামি ডিম তিনি ১২০ টাকায় কিনেছেন, যা গতকাল তাকে ১৩৫ টাকায় কিনতে হয়েছে। তিনি জানান, চাল, ডাল, তেল, সবজিসহ সবকিছুর দামই বেড়েছে, কিন্তু তাদের আয় বাড়েনি।

কৃষি অর্থনীতিবিদ জাহাঙ্গীর আলম খান বলেছেন, জ্বালানি তেলের সংকট ও মূল্যবৃদ্ধি খাদ্য মূল্যস্ফীতিকে উসকে দিতে পারে। বর্তমানে মাঠে বোরো ধান রয়েছে। এ অবস্থায় কৃষিতে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে ডিজেল সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে। কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সভাপতি ও জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের সাবেক মহাপরিচালক এ এইচ এম শফিকুজ্জামান বলেন, জ্বালানি তেলের দাম বাড়ায় নিত্যপণ্যের দামে প্রভাব পড়বে, এটি স্বাভাবিক। কিন্তু দাম কতটা বেড়েছে, সেটি দেখার বিষয়। কারণ, ব্যবসায়ীরা সব সময় পণ্যের দাম বাড়ানোর সুযোগ খোঁজেন। শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের সাবেক এই সচিব বলেন, ইতিমধ্যে প্রায় সব পণ্যের দাম বেড়েছে। কিন্তু ব্যবসায়ী ও সরকারের বক্তব্যে মনে হচ্ছে, সব স্বাভাবিক। তিনি বলেন, ভোক্তা অধিদপ্তরের কাজ বাজারে নিয়মিত মনিটরিং করে পণ্যমূল্য স্বাভাবিক রাখা। কিন্তু এখন তাদের তত্পরতা দৃশ্যমান নয়।

নিউজটি ‍শেয়ার করতে নিচের বাটনগুলোতে চাপ দিন

আরো খবর

বিভাগীয় সংবাদ