মার্চ ২৮, ২০২৬ ১০:৫৮ অপরাহ্ণ

রাজধানীতে ভবন নির্মাণে নতুন বিধিমালা

Facebook
Twitter
LinkedIn
WhatsApp
Print
সংগৃহীত ছবি

নিজস্ব প্রতিবেদক,অমৃতালোক:
ঢাকার ভবন নির্মাণ ক্ষেত্রে নতুন এবং কঠোর বিধিমালা কার্যকর করা হয়েছে। রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক) জানিয়েছে, ভবন ব্যবহারের জন্য অকুপেন্সি সার্টিফিকেট বাধ্যতামূলক হবে এবং এই সনদ ছাড়া কোনো বিদ্যুৎ বা পানির সংযোগ প্রদান বা ফ্ল্যাট বেচা-কেনার অনুমতি দেয়া হবে না। নতুন বিধিমালায় স্থাপত্য নকশার পাশাপাশি স্ট্রাকচারাল, ইলেকট্রিক্যাল ও মেকানিক্যাল ডিজাইন অনুমোদনও বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।

আগে ঢাকা শহরে ভবন নির্মাণের জন্য শুধু স্থাপত্য নকশার অনুমোদন যথেষ্ট ছিল। তবে সমপ্রতি কয়েকটি দুর্ঘটনা এবং নিরাপত্তা সমস্যার কারণে দেখা যায়, পুরনো বিধিমালার দৃষ্টিকোণ শুধু নকশা অনুমোদনেই সীমিত থাকায় ভূমিকম্প, অগ্নিকাণ্ড বা ভবনের ত্রুটিপূর্ণ নির্মাণের ঝুঁকি রয়ে গেছে। ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে রাজউক নতুন নিরাপত্তা ও ব্যবহার বিধিমালা প্রণয়ন করে।

নতুন নিয়মে বলা হয়েছে- স্ট্রাকচারাল ডিজাইন অনুমোদন: ভবনের কাঠামোগত নিরাপত্তা যাচাই করতে হবে। ইলেকট্রিক্যাল ডিজাইন অনুমোদন: বিদ্যুৎ সংযোগ ও বৈদ্যুতিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে।

মেকানিক্যাল ডিজাইন অনুমোদন: লিফট, পাইপলাইন ও অন্যান্য যান্ত্রিক ব্যবস্থার সঠিকতা যাচাই করতে হবে।

অকুপেন্সি সার্টিফিকেট বাধ্যতামূলক: এটি ছাড়া ভবন ব্যবহার করা যাবে না, বিদ্যুৎ-পানি সংযোগ পাওয়া যাবে না এবং ফ্ল্যাট বিক্রি করা সম্ভব হবে না।

রাজউকের চেয়ারম্যান রিয়াজুল ইসলাম বলেছেন, ‘এখন ভবন বা ফ্ল্যাট বেচা-কেনা করতে, বিদ্যুৎ-পানির সংযোগ নিতে অবশ্যই অকুপেন্সি সার্টিফিকেট লাগবেই। এটি না থাকলে কোনো কার্যক্রম অনুমোদিত হবে না।’

রাজধানীতে বর্তমানে ২২ লাখের বেশি ভবন আছে। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, এই ভবনের মধ্যে প্রায় তিন লাখ অবৈধভাবে নির্মিত। অধিকাংশ ভবন পুরোপুরি নির্মাণ বিধিমালা মানছে না। পুরান ও নতুন এলাকারঅনেক ভবনে নিরাপত্তা কমজোরি থাকার কারণে আগুন, ভূমিকম্প বা অন্য দুর্ঘটনার ঝুঁকি বেশি। বিশেষ করে পুরনো ভবনের ক্ষেত্রে নকশা অনুমোদনের অভাব এবং বৈদ্যুতিক-যান্ত্রিক ত্রুটি দেখা গেছে।

নগর পরিকল্পনাবিদ ড. আদিল মুহাম্মদ খান বলেন, ‘নতুন বিধিমালা কার্যকর করা না হলে ভবন নিরাপত্তা নিশ্চিত করা কঠিন হবে। রাজউক ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষদের অবশ্যই কঠোরভাবে এই নিয়ম পালন নিশ্চিত করতে হবে।’ অকুপেন্সি সার্টিফিকেট হচ্ছে একটি প্রমাণপত্র, যা নিশ্চিত করে যে, নির্দিষ্ট ভবনটি নির্মাণ বিধিমালা অনুসারে সম্পন্ন হয়েছে এবং মানুষের বসবাস বা ব্যবহারের জন্য নিরাপদ।

এই সনদে উল্লেখ থাকবে- কোন তলাটি কীভাবে ব্যবহার করা হবে, ভবনের নিরাপত্তা ও নকশার যাচাই, বৈদ্যুতিক ও যান্ত্রিক নিরাপত্তার স্বীকৃতি। এটি না থাকলে ফ্ল্যাট বিক্রি, বিদ্যুৎ-পানি সংযোগ এবং অন্যান্য সুবিধা পাওয়া যাবে না। নতুন বিধিমালা প্রয়োগে ভবনের নিরাপত্তা এবং নগর পরিকল্পনার মান দুই-ই নিশ্চিত হবে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, বিধিমালা কার্যকর করতে হলে শুধু নিয়ম প্রণয়ন যথেষ্ট নয়। রাজউক, নগর প্রশাসন এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর কর্মকর্তাদের জবাবদিহি ও কঠোর নজরদারি নিশ্চিত করতে হবে।

ড. আদিল মুহাম্মদ খান বলেন, ‘কোনো ভবন ছাড়পত্র বা বিদ্যুৎ-পানি সংযোগ দেয়ার আগে সব নকশা অনুমোদন যাচাই করা হবে। এছাড়া নিয়ম ভঙ্গের ক্ষেত্রে জরিমানা এবং প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেয়া হবে।’ নতুন বিধিমালা কার্যকর হলে অবৈধ নির্মাণে জোরদার বিরোধিতা করা যাবে, বৈদ্যুতিক ও যান্ত্রিক ত্রুটি কমবে, নাগরিক নিরাপত্তা বৃদ্ধি পাবে। নতুন বিধিমালা নাগরিকদের জন্যও উপকারী। তারা নিশ্চিত হতে পারবে যে, ক্রয় করা ফ্ল্যাট বা ভবন নিরাপদ এবং বৈধভাবে নির্মিত। এছাড়া বিদ্যুৎ ও পানি সংযোগ বা ফ্ল্যাট লেনদেনের ক্ষেত্রে ঝুঁকি কমবে।

নির্মাণ খাতের ব্যবসায়ীরা বলছেন, যদিও নতুন নিয়মে কিছুটা সময় এবং খরচ বাড়বে, তবে এটি ভবন নিরাপত্তা এবং বাজারের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করবে। রাজউক জানিয়েছে, নতুন বিধিমালা বাস্তবায়নে ডিজিটাল সিস্টেম ব্যবহার করা হবে। সব নকশা, অনুমোদন এবং অকুপেন্সি সার্টিফিকেটের তথ্য অনলাইন প্ল্যাটফর্মে সংরক্ষণ করা হবে। ফলে নাগরিক এবং প্রশাসন দুজনেই তথ্য যাচাই করতে পারবেন।

রাজউক কর্মকর্তা বলেন, ‘প্রতিটি ফ্ল্যাটের জন্য অনলাইন রেকর্ড থাকবে। বিদ্যুৎ-পানি সংযোগের আগে এই তথ্য যাচাই করা হবে। এটি শহরের নিরাপত্তা ও নিয়ন্ত্রণ বাড়াবে।’ সর্বোপরি, ঢাকার ভবন নির্মাণে নতুন বিধিমালা কার্যকর হওয়ায় নগরের নিরাপত্তা, পরিকল্পনা ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত হবে। অকুপেন্সি সার্টিফিকেট বাধ্যতামূলক করার মাধ্যমে ভবন ব্যবহারের নিরাপত্তা, বিদ্যুৎ-পানি সংযোগ এবং ফ্ল্যাট লেনদেন নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হবে।

নগর পরিকল্পনাবিদ ও রাজউকের কর্মকর্তারা আশা করছেন, এই উদ্যোগে অবৈধ নির্মাণ ও নিরাপত্তা ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যাবে। পাশাপাশি, নগরবাসীর জন্য নিরাপদ, বৈধ ও পরিকল্পিত নগর পরিবেশ নিশ্চিত হবে। এভাবে, নতুন বিধিমালা শুধু প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ নয়, বরং নাগরিকদের জীবন ও সম্পদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে কাজ করবে।

নিউজটি ‍শেয়ার করতে নিচের বাটনগুলোতে চাপ দিন

আরো খবর

বিভাগীয় সংবাদ