“আমরা থাকব আপনাদের অগ্রযাত্রার সহযাত্রী হিসেবে, গঠনমূলক সমালোচক এবং তথ্যের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য উৎস হয়ে।”
বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম :
“শুধুই সাংবাদিকতা, সবসময়!”
তিন শব্দের এই প্রতিপাদ্যের ভেতরেই বলা হয়ে গেল বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের ১৯ বছরের কর্মদর্শন।
আর সেই চেতনা ধরে রেখে আগামীর পথে এগিয়ে যাওয়ার প্রত্যয় জানিয়ে দেশের প্রথম এ ইন্টারনেট সংবাদপত্রের প্রধান সম্পাদক প্রধান সম্পাদক তৌফিক ইমরোজ খালিদী মনে করিয়ে দিলেন সংবাদমাধ্যমের এখতিয়ারের সীমানা।
তিনি বললেন, “সংবাদমাধ্যম হিসেবে আমাদের কাজ খবর প্রকাশ করা। শাসন করা নয়, শাসকদের জবাবদিহির আওতায় আনাই আমাদের দায়িত্ব।”
বাংলাদেশের সংবাদ সেবাকে ডিজিটাল দুনিয়ায় পৌঁছে দেওয়া বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম ১৯ বছর পূর্ণ হল বৃহস্পতিবার। ঢাকার র্যাডিসন ব্লু ওয়াটার গার্ডেন হোটেলে সেই উদযাপনে শামিল হয়েছিলেন বিভিন্ন ক্ষেত্রে দেশের শীর্ষ ব্যক্তিরা।
তাদের ধন্যবাদ জানিয়ে ইংরেজিতে দেওয়া বক্তৃতায় খালিদী বলেন, “আধুনিক বাংলাদেশকে যারা আজকের অবস্থানে নিয়ে এসেছেন, যারা আমাদের নীতি নির্ধারক, আমাদের অর্থনীতিকে যারা এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন, প্রতিষ্ঠানগুলোর নেতৃত্ব দিচ্ছেন, জাতিকে অনুপ্রাণিত করে চলেছেন, তারা আজ মিলিত হয়েছেন আমাদের সঙ্গে।
“আপনাদের উপস্থিতি আমাদের জন্য শুধু বিরাট সম্মানের বিষয় নয়, আমাদের কাজের মূল্যবান স্বীকৃতিও বটে।”
ঊনিশের মঞ্চে দাঁড়িয়ে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের প্রধান সম্পাদক ফিরে গেলেন ২০০৮ সালে।
“সতের বছর আগে, এই বলরুমে, ঠিক এই মঞ্চেই আমি দাঁড়িয়েছিলাম। সেদিন ছিল আমাদের দ্বিতীয় প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী। কয়েক সপ্তাহ পরেই ছিল জাতীয় নির্বাচন, যা পরবর্তী দুই দশকের বাংলাদেশের ভাগ্য নির্ধারণ করে দিয়েছিল।
“সেদিন আমরা কথা বলেছিলাম গণতন্ত্র নিয়ে, জবাবদিহিতা, রাজনৈতিক প্রক্রিয়া ও অন্তর্ভুক্তি নিয়ে। মনে পড়ে, আমি বলেছিলাম, সংবাদমাধ্যম এসব ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখতে পারে, কিন্তু এই প্রক্রিয়ার অংশ হতে পারে না।”
বাংলাদেশের গতিপথ বদলে দেওয়া নজিরবিহীন এক অভ্যুত্থানের এক বছরের মাথায় বাংলাদেশ আরেকটি জাতীয় নির্বাচনের দুয়ারে। খালিদী মনে করেন, সংবাদমাধ্যমের ভূমিকা নিয়ে আবারো সেই আলোচনা সামনে আনা প্রয়োজন।
একটি ‘বৈপ্লবিক সিদ্ধান্ত’
শুরুটা হয়েছিল ২০০৫ সালের প্রথমার্ধে। অন্যান্য বার্তা সংস্থার মত ‘বিডিনিউজ’ তখন সংবাদ মাধ্যমগুলোর জন্য খবর সরবরাহ করত। দেশের অন্য সংবাদ সংস্থাগুলো টেলিপ্রিন্টারে খবর সরবরাহ করলেও বিডিনিউজ কাজটি শুরু করে ইন্টারনেটের মাধ্যমে।
২০০৬ সালে বার্তা সংস্থাটির মালিকানা ও ব্যবস্থাপনা বদলের পর এর খোল-নলচে বদলে যায়। সাংবাদিক তৌফিক ইমরোজ খালিদীর নেতৃত্বে নতুন ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ এ সংবাদমাধ্যমকে দেশের প্রথম ডটকম কোম্পানির রূপ দেয়। ২৩ অক্টোবর নতুন আঙ্গিকে শুরু হয় বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের ২৪ ঘণ্টার পথচলা।
সেই দিনটির কথা স্মরণ করে প্রধান সম্পাদক বলেন, “১৯ বছর আগের একটি বৈপ্লবিক সিদ্ধান্তের মুহূর্তকে আমরা উদযাপন করছি। নিছক একটি ওয়েবসাইট চালুর ঘটনা সেটি ছিল না, সেটি ছিল ডিজিটাল যুগের দ্বার উন্মোচনের দিন।”
তিনি বলেন, বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম তখন ছিল পত্রিকা ও টেলিভিশনের জন্য একটি সাবস্ক্রিপশনভিত্তিক সংবাদসেবা।
“আমরা তখনো খবর প্রকাশ করতাম, তবে তা থাকত পে ওয়ালে ঘেরা। আমরা সিদ্ধান্ত নিলাম, সেই দেয়াল আমরা ভেঙে ফেলব। আমরা রূপান্তরিত হলাম ২৪ ঘণ্টার, সবার জন্য উন্মুক্ত একটি সংবাদমাধ্যমে, যেখানে বাংলাদেশের প্রত্যেক ইন্টারনেট ব্যবহারকারী বিনামূল্যে খবর পড়তে পারেন।”
খালিদী বলেন, “সেই মুহূর্তে আমরা যে শুধু ব্যবসার ধরন পাল্টে ফেললাম, তা নয়; আমাদের নিয়তিও বদলে গেল। সীমিত গ্রাহককে সেবা দেওয়ার বদলে আমরা পৌঁছে গেলাম বৃহৎ জনপরিসরে। দেশের প্রথম অনলাইন সংবাদপত্র হয়ে উঠলাম আমরা। আমাদের বিশ্বাস, পুরো বিশ্বেও এই ধরনের প্রথম সংবাদমাধ্যমগুলোর একটি বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম।
“সংবাদপত্রের জন্য অপেক্ষা থাকার যুগ শেষ হয়ে গেল সেই রাতে। ঘটনা আর সংবাদ প্রচারের মধ্যে সময়ের ব্যবধান ঘুচে গেল। বার্তাকক্ষের প্রথাগত কর্মধারা অতীত হয়ে গেল। খবরের ভবিষ্যৎ চলে এল আমাদের স্ক্রিনে, আর সেটা সম্পূর্ণ বিনামূল্যে।”
তার ভাষায়, “এটি নিছক কাজের ধরন বদলানো নয়, এটি ছিল একটি ইশতেহার। মানুষের জানার অধিকার যে সীমাহীন, এটি ছিল তারই ঘোষণা।
“আমরা বাজি ধরেছিলাম বাংলাদেশের কৌতুহলী মানুষের ওপর। আর আপনারা—এই ঘরে উপস্থিত প্রত্যেকে এবং বাইরের লক্ষ লক্ষ মানুষ প্রমাণ করে দিয়েছেন, আমরা ভুল করিনি।”
নানা ক্ষেত্রে যারা বাংলাদেশের বাঁক বদলের সাক্ষী, তাদের সামনে রেখে খালিদী বলেন, “দ্রুত পরিবর্তনের মধ্যে দিয়ে এগিয়ে চলা এক জাতির ইতিহাস আমরা লিপিবদ্ধ করার অনন্য সুযোগ পেয়েছি উনিশ বছর ধরে। বোর্ডরুমে যেসব সিদ্ধান্ত আপনারা নিয়েছেন, যেসব নীতি আপনারা প্রণয়ন করেছেন, আমরা তার ডিজিটাল সাক্ষী হয়েছি। আপনাদের পথচলা আর বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের অভিযাত্রা একই সূত্রে গাঁথা।”
‘পরের বিপ্লবের দিকে দৃষ্টি দেওয়ারও মুহূর্ত’
বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের ১৯ বছরের পথচলা যে সহজ ছিল না, সে কথা তুলে ধরে প্রধান সম্পাদক বলেন, “আমাদের প্রতিনিয়ত উদ্ভাবন করে যেতে হয়েছে। ধরে রাখতে হয়েছে নির্ভুলতা, নিরপেক্ষতা আর স্বাধীনতার নীতি। ভ্রান্তিময় এক যুগে আমরা চেষ্টা করেছি আপনার কাছে আস্থা আর স্পষ্টতার প্রতীক হয়ে উঠতে।
“তবে আজকের এই রাত শুধু অতীত স্মরণ করবার জন্য নয়, এটা পরবর্তী বিপ্লবের দিকে দৃষ্টি দেওয়ারও মুহূর্ত।”
তার ভাষায়, “আগামী দশক হবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যুগ, তথ্যের জগতে সত্যের জন্য লড়াইয়ের যুগ, বাংলাদেশের অগ্রযাত্রায় নতুন এক উল্লম্ফনের যুগ। আর এই সময়ে একটি বিশ্বাসযোগ্য, দ্রুত, সবার জন্য উন্মুক্ত সংবাদমাধ্যমের ভূমিকা হবে আগের যে কোনো সময়ের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ।”
সেই নতুন সময়ের জন্য বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের পরিকল্পনা তুলে ধরে খালিদী বলেন, “আজ আমরা অঙ্গীকার করছি, ২০০৬ সালের সেই সিদ্ধান্তের চেতনা—‘উন্মুক্ত, যতটা সম্ভব বিনামূল্যে এবং প্রথম’ থাকার যে নীতি—সেটাই আমাদের পথপ্রদর্শক থাকবে। আমরা নতুন প্রযুক্তিকে ব্যবহার করব, তবে সাংবাদিকতাকে প্রতিস্থাপন করার জন্য নয়, শক্তিশালী করার জন্য।
“আমরা বিনিয়োগ করব অনুসন্ধানী সাংবাদিকতায়—যা ক্ষমতাকে জবাবদিহিতায় রাখে; বিনিয়োগ করব সেইসব প্ল্যাটফর্মে, যা সংবাদকে প্রতিটি নাগরিকের অধিকার হিসেবে রক্ষা করবে, সুযোগ হিসেবে নয়।”
চব্বিশের অভ্যুত্থানের পর পুরো জাতি যে ‘গভীর এক আত্মসমীক্ষার’ মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, সে কথা তুলে ধরে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের প্রধান সম্পাদক বলেন, কেবল অর্থনৈতিক সূচকের ওপর দাঁড়িয়ে কোনো জাতি বিকশিত হতে পারে না; তার প্রয়োজন ‘স্থিতিশীল ভিত্তি, সুশাসনের নিশ্চয়তা আর আইনের শাসনের প্রতি অটল বিশ্বাস’।
“বিগত বছরগুলো আমাদের দেখিয়েছে, বিশৃঙ্খলার জন্য কত চড়া মূল্য দিতে হয়। আইন-শৃঙ্খলা যখন ভেঙে পড়ে, তখন কেবল সংবাদ শিরোনামেই তার প্রভাব পড়ে না, বরং উদ্যোক্তারা বিনিয়োগ করতে দ্বিধায় পড়ে যান, উদ্ভাবকরা ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তায় পড়েন, সাধারণ মানুষ তাদের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে ওঠে।
“অসীম সম্ভাবনার দেশ বাংলাদেশের আরও ভালো কিছু প্রাপ্য। এই দেশের এমন একটি স্থিতিশীল পরিবেশ পাওয়া উচিত, যেখানে নির্দ্বিধায় ব্যবসায়িক পরিকল্পনা সাজানো যায়, যেখানে প্রতিটি নাগরিক নিরাপদ বোধ করতে পারে।”
কিন্তু চুপচাপ বসে থাকলেই যে স্থিতিশীলতা আসে না, সে কথা মনে করিয়ে দিয়ে তিনি বলেন, “স্থিতিশীলতা আসে জবাবদিহিমূলক ও প্রতিনিধিত্বশীল শাসন থেকে। জনগণের সরকার মানে সেই সরকার, যা জনগণের কাছে জবাবদিহি করে; যারা বলার চেয়ে শোনে বেশি; যারা ভিন্নমতকে হুমকি হিসেবে দেখে না, বরং গুরুত্বপূর্ণ নিয়ামক হিসেবে দেখে।”
খালিদী বলেন, “আমরা বিশ্বাস করি, যে স্থিতিশীলতা ও সমৃদ্ধির পথ আমরা খুঁজি, তা শক্তিশালী ও স্বাধীন প্রতিষ্ঠান এবং স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক সরকারের হাত ধরেই পাওয়া সম্ভব। এটি কোনো রাজনৈতিক অবস্থান নয়; এটি গণতান্ত্রিক প্রয়োজন।
“আমরা থাকব আপনাদের অগ্রযাত্রার সহযাত্রী হিসেবে, গঠনমূলক সমালোচক এবং তথ্যের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য উৎস হয়ে।”
৫ অগাস্ট পরবর্তী অস্থির সময়ে দেশের সংবাদমাধ্যমগুলো যখন ব্যাপক রূপান্তরের মধ্য দিয়ে যাচ্ছিল, সেই সময়ও বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের সম্পাদকীয় অবস্থান অপরিবর্তিত থাকায় প্রশংসা পাওয়ার কথা বলেন প্রধান সম্পাদক।
তিনি বলেন, “রাষ্ট্র পরিচালনা এক গুরু দায়িত্ব। সেজন্য দরকার বৈধ ম্যান্ডেট। সেই দায়িত্ব থাকবে এমন মানুষের হাতে, যাদের তাৎক্ষণিক ও দীর্ঘমেয়াদি সিদ্ধান্ত নেওয়ার সক্ষমতা আছে; যারা জটিল পররাষ্ট্রনীতি ও নিরাপত্তার বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা করতে পারেন; এবং যারা সেই লাখো মানুষকে ভুলে যাবেন না, যারা ৫৪ বছর আগে আমাদের স্বাধীনতার জন্য যুদ্ধ করেছেন, জীবন উৎসর্গ করেছেন।
“সেই আদর্শ চিত্র থেকে আমরা এখনো বহু দূরে। সেই লক্ষ্যে পৌঁছাতে আমাদের সবাইকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। তবে আমরা, সংবাদমাধ্যম কেবল সহায়ক ভূমিকা নিতে পারি, কখনোই মূল ভূমিকা নয়।”








