নিউজ ডেস্ক,অমৃতালোক:
নির্বাসিত জীবন শেষে বাংলাদেশে ফিরে আসা বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিতব্য ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিজয়ের পথে রয়েছেন বলে আন্তর্জাতিক সংবাদসংস্থা রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। তিনি দেশের শাসনভার গ্রহণের চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছেন বলেও প্রতিবেদনটিতে উল্লেখ করা হয়।
আজ মঙ্গলবার (১০ ফেব্রুয়ারি) রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়, লন্ডনে প্রায় দুই দশকের নির্বাসন কাটিয়ে দেশে ফেরার মাত্র দুই মাসেরও কম সময়ের মধ্যে, তারেক রহমান বাংলাদেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এক নির্বাচনে জয়ী হয়ে প্রধানমন্ত্রী হতে পারেন। সে ক্ষেত্রে তিনি দেশটির নেতৃত্ব দেবেন, যেটি একসময় শাসন করেছেন তার বাবা-মা।
মতামত জরিপগুলো যদি সঠিক প্রমাণিত হয়, তবে বৃহস্পতিবারের নির্বাচন হবে ৬০ বছর বয়সী এই স্বল্পভাষী নেতার জন্য এক নাটকীয় প্রত্যাবর্তন। ২০০৮ সালে সেনা-সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় কথিত দুর্নীতিবিরোধী অভিযানে গ্রেপ্তার হয়ে কারামুক্তির পর চিকিৎসার প্রয়োজনে তিনি দেশ ছাড়েন।
এরপর প্রায় দুই দশকের নির্বাসিত জীবন শেষে গত বছরের ২৫ ডিসেম্বর এক নায়কোচিত অভ্যর্থনার সাথে তিনি দেশে ফেরেন। এর আগে, ২০২৪ সালের আগস্টে ছাত্র-জনতার নেতৃত্বে হওয়া এক গণঅভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত হন আওয়ামী লীগের সভানেত্রী ও দীর্ঘদিনের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।
বর্তমানে শেখ হাসিনা আশ্রয় নিয়েছেন ভারতের নয়াদিল্লিতে। একসময় বাংলাদেশের রাজনীতিতে দীর্ঘদিন আধিপত্য বিস্তার করেছিলেন তিনি এবং তারেক রহমানের মা, সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া। তারেক রহমানের বাবা শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান ছিলেন বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ-পরবর্তী এক অবিসংবাদিত নেতা, যিনি ১৯৭৭ থেকে ১৯৮১ সাল পর্যন্ত দেশ শাসন করেন, পরে হত্যাকাণ্ডের শিকার হন।
রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়, তারেক রহমান অঙ্গীকার করেছেন তিনি বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক নতুনভাবে সাজাবেন যাতে বিনিয়োগ বাড়ে, কিন্তু দেশ কোনো একটি শক্তির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল হয়ে না পড়ে। এটি শেখ হাসিনার নীতির সঙ্গে ভিন্ন, যাকে অনেকেই দিল্লিকেন্দ্রিক বলে মনে করতেন।
তিনি দরিদ্র পরিবারের জন্য আর্থিক সহায়তা বাড়ানোর কথা বলেছেন, পোশাক শিল্পের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে খেলনা ও চামড়াজাত পণ্যের মতো খাত উন্নয়নের পরিকল্পনা তুলে ধরেছেন। পাশাপাশি, স্বৈরতান্ত্রিক প্রবণতা ঠেকাতে প্রধানমন্ত্রীদের জন্য দুই মেয়াদের মোট ১০ বছর সীমা নির্ধারণের প্রস্তাব দিয়েছেন।
রয়টার্সকে দেওয়া সাক্ষাৎকারের ফাঁকে তিনি বলেন, ‘ঢাকায় নিজের কার্ডিওলজিস্ট স্ত্রী ও ব্যারিস্টার মেয়েকে নিয়ে ফেরার পর থেকে ঘটনাপ্রবাহ এত দ্রুত ঘটেছে যে; সময় কীভাবে কেটেছে তা নিজেও ঠিকমতো বোঝেননি। তিনি বলেন, আমরা বাংলাদেশের মাটিতে পা রাখার পর থেকে প্রতিটি মিনিট কীভাবে কেটেছে, আমি নিজেও জানি না।’
সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া ও বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা সাবেক প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের ঘরে ১৯৬৫ সালের ২০ নভেম্বর তারেক রহমান জন্মগ্রহণ করেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আন্তর্জাতিক বিভাগে পড়াশোনা শুরু করলেও তা শেষ করেননি। পরে তিনি বস্ত্র ও কৃষিভিত্তিক ব্যবসায় জড়িত হন।
দেশে ফেরার পর থেকে তারেক রহমান নিজেকে এমন এক রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে তুলে ধরতে চাইছেন, যিনি শেখ হাসিনার শাসনামলে নিজের পরিবারের ওপর হওয়া নির্যাতনের বাইরে তাকাতে প্রস্তুত। বিএনপির ২০০১-২০০৬ মেয়াদের সেই দাপুটে ভাবমূর্তি এখন আর নেই। তখন তার মা প্রধানমন্ত্রী থাকলেও তিনি কোনো সরকারি পদে ছিলেন না। তবু অভিযোগ ছিল, তিনি নেপথ্যে থেকে আলাদা একটি ক্ষমতার কেন্দ্র পরিচালনা করতেন; যা তিনি বরাবরই অস্বীকার করেছেন।
‘প্রতিশোধে কী পাওয়া যায়’? বলে রয়টার্সকে প্রশ্ন করেন তিনি। এরপর বলেন, ‘প্রতিশোধের কারণে মানুষ দেশ ছেড়ে পালাতে বাধ্য হয়। এতে কোনো কল্যাণ আসে না। এই মুহূর্তে দেশের সবচেয়ে বড় প্রয়োজন শান্তি ও স্থিতিশীলতা।’
শেখ হাসিনার শাসনামলে তারেক রহমান ছিলেন দুর্নীতি মামলার প্রধান লক্ষ্যবস্তু। একাধিক মামলায় অনুপস্থিত অবস্থায় তিনি দণ্ডিত হন। ২০০৪ সালে শেখ হাসিনার জনসভায় গ্রেনেড হামলার ঘটনায়; যাতে বহু মানুষ নিহত ও আহত হন, সে মামলায় ২০১৮ সালে তাকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়। তিনি সব অভিযোগই রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে দাবি করে আসছেন। হাসিনার ক্ষমতাচ্যুতির পর সব মামলাতেই তিনি খালাস পান।








