নিউজ ডেস্ক,অমৃতালোক:
ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলার পর মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে উত্তেজনা দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে এবং তেহরান পাল্টা প্রতিক্রিয়া শুরু করে। এরই মধ্যে ইরানের দক্ষিণাঞ্চলীয় হরমোজগান প্রদেশের মিনাব কাউন্টিতে একটি মেয়েদের প্রাথমিক বিদ্যালয়ে হামলার ঘটনা ঘটে।
ইরানি রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটির মুখপাত্র মুজতবা খালিদি বলেছেন, ইরানের প্রায় ২০টি প্রদেশ যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার লক্ষ্যবস্তু হয়েছে। তার বক্তব্য অনুযায়ী, এসব হামলার পর আহতদের জন্য ত্রাণ ও উদ্ধার কার্যক্রম শুরু হয়েছে। ইরানের বিভিন্ন শহর থেকে ধোঁয়া ওঠা বা বিস্ফোরণের অসংখ্য ছবি প্রকাশিত হয়েছে।
ইরানের রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা আইআরএনএ শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র আলী ফরহাদির বরাতে জানায়, স্কুলটি তিনটি ক্ষেপণাস্ত্র হামলার লক্ষ্যবস্তু ছিল। এ ঘটনায় নিহতের সংখ্যা বেড়ে ৫৩ জনে দাঁড়িয়েছে এবং আহত হয়েছেন আরও ৬৩ জন। ধ্বংসাবশেষ সরিয়ে সম্ভাব্য হতাহতদের সন্ধান চালানো হচ্ছে।
ইরানের প্রতিশোধমূলক হামলা শুরু হলে ইসরায়েলজুড়ে সাইরেন ও মোবাইল সতর্কতা জারি করা হয়। একই সময়ে কুয়েতের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানায়, আলী আল সালেম বিমানঘাঁটি লক্ষ্য করে কয়েকটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করা হয়েছিল, তবে সেগুলো দেশটির আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ভূপাতিত করে। জর্ডানও জানায়, তাদের ভূখণ্ড লক্ষ্য করে আসা দুটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র তারা ভূপাতিত করেছে; এতে প্রাণহানি না হলেও বস্তুগত ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে।
এই পরিস্থিতিতে ওমান অবিলম্বে সামরিক অভিযান স্থগিতের আহ্বান জানায় এবং জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদকে যুদ্ধবিরতি কার্যকরের জন্য জরুরি বৈঠক করার অনুরোধ করে। ওমানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বাদর আল বুসাইদি, যিনি যুক্তরাষ্ট্র–ইরান আলোচনায় মধ্যস্থতাকারী ছিলেন, যুক্তরাষ্ট্রকে এই যুদ্ধে আরও জড়িত না হওয়ার আহ্বান জানান এবং বলেন, সাম্প্রতিক গুরুতর আলোচনাগুলো এই সংঘাতের কারণে দুর্বল হয়ে পড়েছে। এর আগে জেনেভায় তৃতীয় দফা ইরান–মার্কিন আলোচনার পর ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি বলেছিলেন, আলোচনায় ভালো অগ্রগতি হয়েছে।
পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠলে যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স ও জার্মানি ইরানের প্রতিবেশী দেশগুলোতে হামলার নিন্দা জানায়। ফরাসি প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল ম্যাক্রোঁ, জার্মান চ্যান্সেলর ফ্রিডরিখ মের্টজ এবং ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী কিয়ের স্টারমার এক যৌথ বিবৃতিতে আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা ও বেসামরিক সুরক্ষার ওপর গুরুত্বারোপ করেন এবং ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে আলোচনা পুনরারম্ভের আহ্বান জানান। ম্যাক্রোঁ জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের জরুরি বৈঠকের আহ্বান জানিয়ে সতর্ক করেন, এই যুদ্ধ আন্তর্জাতিক শান্তি ও নিরাপত্তার জন্য মারাত্মক পরিণতি বয়ে আনতে পারে।
এদিকে মধ্যপ্রাচ্যের এই নিরাপত্তা পরিস্থিতির প্রভাব পড়ে বাংলাদেশেও। ইরান ও অঞ্চলজুড়ে হামলা-পাল্টা হামলার পর বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স ঢাকা থেকে মধ্যপ্রাচ্যগামী সকল ফ্লাইট সাময়িকভাবে স্থগিত করে। এক বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, দাম্মাম, জেদ্দা, মদিনা, রিয়াদ, শারজাহ, আবুধাবি, দুবাই ও কুয়েতসহ সব গন্তব্যে ফ্লাইট পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত বন্ধ থাকবে এবং যাত্রীদের বিমানবন্দরে না এসে নির্ধারিত নম্বরে যোগাযোগ করতে বলা হয়।
সংঘাত ঘিরে বিশ্বনেতাদের প্রতিক্রিয়াও আসে ধারাবাহিকভাবে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ভন ডার লিয়েন সব পক্ষকে সংযম দেখাতে ও আন্তর্জাতিক আইন মেনে চলার আহ্বান জানান। ইতালির প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনি ইরানের বেসামরিক জনগণের প্রতি সংহতি প্রকাশ করেন। অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রী অ্যান্থনি আলবানিস ইরানের জনগণের পাশে থাকার কথা জানান এবং ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন থেকে বিরত রাখার প্রচেষ্টায় যুক্তরাষ্ট্রকে সমর্থন করেন। রাশিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের পদক্ষেপকে বেপরোয়া ও আন্তর্জাতিক আইনবিরোধী বলে আখ্যা দিয়ে কূটনৈতিক সমাধানের আহ্বান জানায়।








