নিজস্ব প্রতিবেদক,অমৃতালোক :
ভয়াবহ তাপপ্রবাহ আর অসহ্য গরমে যখন জনজীবন ওষ্ঠাগত, ঠিক তখনই দোসর হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে তীব্র বিদ্যুৎ সংকট। একদিকে দেশের ২৪টি জেলায় বয়ে যাচ্ছে মাঝারি থেকে তীব্র তাপপ্রবাহ, অন্যদিকে জ্বালানি সংকট ও কারিগরি ত্রুটির অজুহাতে বাড়ছে লোডশেডিং। বিশেষ করে গ্রামীণ জনপদে বিদ্যুতের এই সংকট এখন মানবিক বিপর্যয়ের পর্যায়ে পৌঁছেছে। চাহিদার তুলনায় উৎপাদন কম হওয়ায় সারা দেশে দৈনিক আড়াই থেকে তিন হাজার মেগাওয়াট পর্যন্ত ঘাটতি দেখা দিচ্ছে, যার বড় অংশই বইতে হচ্ছে পল্লী বিদ্যুতের গ্রাহকদের।
চাহিদা ও উৎপাদনের যাঁতাকল, বিভ্রান্তিকর তথ্য : সরকারি হিসাব মতে, বর্তমানে দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা প্রায় ২৯ হাজার মেগাওয়াট। কিন্তু খাতা-কলমে এই সক্ষমতা থাকলেও বাস্তবে জ্বালানির অভাবে কেন্দ্রগুলো চালু রাখা সম্ভব হচ্ছে না। গত মঙ্গলবার রাতে দেশে লোডশেডিংয়ের পরিমাণ ২ হাজার ১৬৮ মেগাওয়াট ছাড়িয়ে গেলেও বুধবার দিনের বেলায় তা আড়াই হাজার মেগাওয়াট অতিক্রম করেছে।
তবে সরকারি সংস্থা পিজিসিবি (পাওয়ার গ্রিড পিএলসি বাংলাদেশ) এবং বিতরণ সংস্থা আরইবির (পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ড) তথ্যে ব্যাপক গরমিল লক্ষ করা গেছে। আরইবির দাবি অনুযায়ী, বুধবার দুপুরেই তাদের এলাকায় ঘাটতি ছিল ৩ হাজার ৩৫০ মেগাওয়াট। বিতরণ সংস্থাগুলো বলছে, চাহিদার সঠিক হিসাব পাওয়া না যাওয়ায় এবং উৎপাদন কেন্দ্র থেকে পর্যাপ্ত বিদ্যুৎ না মেলায় সরবরাহ ব্যবস্থা ভেঙে পড়ছে।
জ্বালানি সংকট ও আদানির কারিগরি বাধা : বিদ্যুৎ সংকটের মূলে রয়েছে জ্বালানির তীব্র অভাব। বিগত সরকারের আমল থেকে চলে আসা বিপুল বকেয়াপরিশোধ না করায় তেল ও কয়লা আমদানি ব্যাহত হচ্ছে। ফলে ফার্নেস ওয়েলচালিত বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর একটি বড় অংশ অলস বসে আছে।
এর মধ্যে ‘মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা’ হিসেবে দেখা দিয়েছে ভারতের আদানি গ্রুপের বিদ্যুৎকেন্দ্রের বিপর্যয়। ঝাড়খন্ডে অবস্থিত ১ হাজার ৬০০ মেগাওয়াট ক্ষমতার এই কেন্দ্রের একটি ইউনিট কারিগরি ত্রুটির কারণে বন্ধ হয়ে গেছে। আগে যেখানে আদানি থেকে ১৫০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ আসত, এখন তা কমে ৭৫০ মেগাওয়াটে নেমেছে। পিডিবি সূত্র জানিয়েছে, এই সংকট কাটতে আরও কয়েক দিন সময় লাগতে পারে। এছাড়া পটুয়াখালীর পায়রা ও চট্টগ্রামের বাঁশখালী বিদ্যুৎকেন্দ্রও কয়লা সংকটে পূর্ণ ক্ষমতায় চলতে পারছে না।
শহর বনাম গ্রাম- প্রকট বিদ্যুৎ বৈষম্য : রাজধানী ঢাকাসহ বড় শহরগুলোতে লোডশেডিং তুলনামূলক কম হলেও গ্রামের চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ম. তামিমের মতে, ঘাটতি হলেই তা গ্রামের ওপর চাপিয়ে দেয়া এক ধরনের অলিখিত নিয়মে পরিণত হয়েছে। বিভাগীয় ও আঞ্চলিক চিত্র
ময়মনসিংহ অঞ্চল: দেশের সবচেয়ে বেশি লোডশেডিং হচ্ছে এই অঞ্চলে। আরইবির তথ্যমতে, এখানে চাহিদার তুলনায় ৪৮ শতাংশ কম বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হচ্ছে। স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, দিনে ৬ থেকে ৭ বার বিদ্যুৎ যাচ্ছে এবং গড়ে ১০ থেকে ১২ ঘণ্টা অন্ধকারেই থাকতে হচ্ছে। রংপুর ও খুলনা: উত্তরবঙ্গে তাপমাত্রার পারদ ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াস ছুঁলেও বিদ্যুৎ সরবরাহ কম প্রায় ৪০ শতাংশ।
বিশেষ করে সেচ মৌসুমে বিদ্যুৎ না থাকায় বোরো ধান চাষিরা দিশেহারা হয়ে পড়েছেন। ঢাকা ও চট্টগ্রাম: ডেসকো ও ডিপিডিসি এলাকায় এখন পর্যন্ত বড় কোনো ঘাটতি নেই বললেই চলে। তবে মাঝে মাঝে কারিগরি ত্রুটির কারণে বিদ্যুৎ বিভ্রাট ঘটছে। জনজীবনে ত্রাহি মধুসূদন অবস্থা : তীব্র গরমে ঘরে ঘরে শিশুদের নাভিশ্বাস দশা। চট্টগ্রাম থেকে ময়মনসিংহ, সবখানেই হাতপাখা আর তালপাতার পাখা হয়ে উঠেছে জীবন রক্ষার শেষ সম্বল।
ময়মনসিংহের তারাকান্দার এক ভুক্তভোগী মা বলেন, ‘২৪ ঘণ্টায় মাত্র কয়েক ঘণ্টা বিদ্যুৎ পাই। গরমে বাচ্চাগুলো ঘুমাতে পারছে না, পড়াশোনা ব্যাহত হচ্ছে। এসএসসি পরীক্ষার্থীদের অবস্থা আরও শোচনীয়; রাতে মোমবাতি বা কুপির আলোতে পড়াশোনা করতে গিয়ে তারা শারীরিক ও মানসিকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়ছে।
কৃষি ও সেচ ব্যবস্থায় ধস : বদরগঞ্জের চাষি আব্দুল হালিমের মতো হাজারো কৃষক এখন পানির অভাবে হাহাকার করছেন। শ্যালো মেশিন চালানোর মতো বিদ্যুৎ নেই, আবার ডিজেল পাম্পগুলোও জ্বালানি সংকটের কারণে নিয়মিত খোলা থাকছে না। ফলে সেচ অভাবে অনেক জায়গায় বোরো ধান পুড়ে যাওয়ার উপক্রম হয়েছে। বিদ্যুৎ সংকটের এই প্রভাব দীর্ঘমেয়াদে খাদ্য নিরাপত্তার ওপর হুমকি হয়ে দাঁড়াতে পারে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
বিশেষজ্ঞদের উদ্বেগ ও আগামী দিনের পূর্বাভাস : আবহাওয়াবিদদের মতে, আগামী শুক্রবার থেকে তাপপ্রবাহ আরও বাড়তে পারে। সেক্ষেত্রে বিদ্যুতের চাহিদা ১৮ হাজার মেগাওয়াট ছাড়িয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সক্ষমতা বাড়িয়ে কোনো লাভ নেই যদি জ্বালানি আমদানির জন্য প্রয়োজনীয় ডলারের সংস্থান না করা যায়। এছাড়া বিগত দিনের ভুল নীতি এবং ক্যাপাসিটি চার্জের বোঝা বিদ্যুৎ খাতকে পঙ্গু করে দিয়েছে।
পিডিবি সদস্য (উৎপাদন) মো. জহুরুল ইসলাম জানান, ফার্নেস ওয়েল ও ডিজেলচালিত কেন্দ্রগুলো থেকে উৎপাদন বাড়িয়ে পরিস্থিতি সামাল দেয়ার চেষ্টা চলছে। তবে কয়লা ও আদানির সংকট দ্রুত সমাধান না হলে সাধারণ মানুষের এই ভোগান্তি সহজে কমবে বলে মনে হচ্ছে না। বিদ্যুৎ এখন আর কেবল বিলাসিতা নয়, এটি মানুষের মৌলিক প্রয়োজনে পরিণত হয়েছে।
বিশেষ করে গ্রামীণ অর্থনীতির চাকা সচল রাখতে বিদ্যুতের সুষম বণ্টন জরুরি। ঢাকাকে আলোকিত রেখে গ্রামকে অন্ধকারে ডুবিয়ে রাখার এই ‘বিদ্যুৎ বৈষম্য’ নিরসনে সরকারকে জরুরি ভিত্তিতে পদক্ষেপ নিতে হবে। অন্যথায়, দাবদাহ আর লোডশেডিংয়ের এই দ্বিমুখী প্রকোপে জনরোষ তৈরি হওয়া কেবল সময়ের ব্যাপার।
লোডশেডিং করতে বাধ্য হচ্ছি : বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী
বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত বলেছেন, গত বুধবার বিদ্যুতের চাহিদা ছিল ১৬ হাজার মেগাওয়াট অথচ উৎপাদন হয়েছে ১৪ হাজার ১২৬ দশমিক ৩৫ মেগাওয়াট। অর্থাৎ দিনে ২ হাজার ৮৬ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ ঘাটতি; তাই লোডিশেডিং করতে বাধ্য হতে হচ্ছে। গতকাল বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদে জনগুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে বক্তব্য দিতে গিয়ে প্রতিমন্ত্রী এসব কথা বলেন।
লোডশেডিংয়ে মানুষের দুর্ভোগ হচ্ছে স্বীকার করে প্রতিমন্ত্রী বলেন, স্বীকার করতে কোনো দ্বিধা নেই এই উত্তপ্ত গরমে আমাদের অনেকে বিদ্যুৎ সমস্যায় নাজেহাল হচ্ছেন। বিদ্যুৎ সমস্যা বর্তমান নির্বাচিত সরকারের নয়, বিগত ফ্যাসিস্ট সরকারের অব্যবস্থাপনার দায় আমাদের সবাইকে নিতে হচ্ছে। উৎপাদন ক্ষমতা কাগজে-কলমে বেশি থাকলেও বাস্তবতায় গরমিল রয়েছে।’
জ্বালানি সংকট নিরসনে সরকারি-বিরোধীদল এক হয়েছে জানিয়ে অমিত বলেন, গত বুধবার জ্বালানি বিষয় নিয়ে সরকারি দল এবং বিরোধীদল বিষদ আলোচনা করেছে। এই আলোচনার সবচেয়ে বড় অর্জন যে টোন সেট হয়েছে অর্থাৎ ঐক্যবদ্ধভাবে দেশ পরিচালনা করার। যার ধারাবাহিকতায় প্রধানমন্ত্রী ১০ সদস্যের কমিটি গঠনের প্রস্তাব দিয়েছেন। এটা জাতির জন্য নতুন পথের দিশা হয়ে থাকবে। নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সাপ্লাই নিশ্চিত করার জন্য বিরোধীদলীয় নেতার সঙ্গে আলোচনা করে পরামর্শ গ্রহণ করেছি।
রাঙামাটির কাপ্তাইয়ে কর্ণফুলী পানি বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্রে বিদ্যুৎ উৎপাদন আরও হ্রাস পেয়েছে। হ্রদে পানিস্বল্পতার কারণে বর্তমানে কেন্দ্রের পাঁচটি ইউনিটের মধ্যে শুধু একটিতে বিদ্যুৎ উৎপাদন হচ্ছে। আর এই একটি ইউনিট থেকে মাত্র ৪০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন হচ্ছে। এই কেন্দ্রে পাঁচটি ইউনিটের মাধ্যমে সর্বোচ্চ বিদ্যুৎ উৎপাদন হয় ২৪২ মেগাওয়াট।
বিষয়টি নিশ্চিত করে বিদ্যুৎকেন্দ্রের ব্যবস্থাপক প্রকৌশলী মাহমুদ হাসান বলেন, শুষ্ক মৌসুমে কাপ্তাই হ্রদের পানির স্তর দিন দিন কমতে থাকে। আর পানির ওপর নির্ভরশীল এই কেন্দ্রের পাঁচটি ইউনিটের মধ্যে গত বুধবার সকাল ৯টা পর্যন্ত শুধু ২নং ইউনিট থেকে ৪০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন হচ্ছে। বর্তমানে রুলকার্ভ অনুযায়ী কাপ্তাই হ্রদে ৮৩.৮০ এমএসএল (মিনস সি লেভেল) পানি থাকার কথা থাকলেও গত বুধবার সকাল ৯টা পর্যন্ত কাপ্তাই হ্রদে পানির লেভেল ছিল ৭৭. ৪৭ এমএসএল।
কাপ্তাই কর্ণফুলী পানি বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্রের কন্ট্রোল রুমে দায়িত্বরত প্রকৌশলীরা জানান, বিগত সপ্তাহগুলোতে কেন্দ্রের পাঁচটি ইউনিটের মধ্যে দুটি ইউনিট চালু রেখে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা হতো। কাপ্তাই হ্রদের পানির স্তর দ্রুত কমতে থাকায় গত মঙ্গলবার থেকে শুধু একটি করে ইউনিট চালু রেখে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা হচ্ছে। যতদিন বৃষ্টি হবে না, ততদিন পর্যন্ত এই সমস্যার সমাধান হবে না।
দিনাজপুরের বড়পুকুরিয়া তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রের উৎপাদন বন্ধ
দিনাজপুরের পাবতীপুর বড়পুকুরিয়া তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রের তিনটি ইউনিটের মধ্যে সচল ১নং নম্বর ইউনিটটির যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে উৎপাদন বন্ধ হয়ে গেছে। এতে করে বর্তমানে বড়পুকুরিয়া তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রের উৎপাদন পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেল। গত বুধবার রাত ১০টা ১০ মিনিটে ১২৫ মেগাওয়াট উৎপাদন ক্ষমতাসম্পন্ন ১নং ইউনিটটি বন্ধ হয়ে যায়। ফলে বিদ্যুৎ বিভ্রাটে পড়েছে দিনাজপুরসহ উত্তরের ৮ জেলা।
বিষয়টি নিশ্চিত করে বড়পুকুরিয়া তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রের প্রধান প্রকৌশলী আবু বক্কর সিদ্দিক জানান, কয়লার সঙ্গে পাথর আসায় ১নং ইউনিটের বয়লার পাইপ ফেটে যায় ও ও কুলিং ফ্যান ভেঙে গেছে। এতে গত বুধবার রাত ১০টা ১০ মিনিটে পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায় তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রের উৎপাদন। তিনি বলেন, মেরামত কাজ চলছে, এটি মেরামত করে আবার উৎপাদন শুরু করতে ৪ থেকে ৫ দিন সময় লাগতে পারে। এর আগে দীর্ঘদিন থেকেই বন্ধ রয়েছে ওই বিদ্যুৎ কেন্দ্রের ১২৫ মেগাওয়াট উৎপাদন ক্ষমতাসম্পন্ন ২নং ইউনিট এবং ২৭৫ উৎপাদন ক্ষমতাসম্পন্ন ৩নং ইউনিট।
দিনাজপুরের বড়পুকুরিয়া কয়লাখনির উৎপাদিত কয়লার ওপর ভিত্তি করে খনির পাশেই ২০০৬ সালে গড়ে উঠে কয়লাভিত্তিক বড়পুকুরিয়া তাপ বিদ্যুৎ কেন্দ্র। প্রথম অবস্থায় ১২৫ মেগাওয়াট করে মোট ২৫০ মেগাওয়াট উৎপাদন ক্ষমতা সম্পন্ন দুটি ইউনিট স্থাপন করা হয়। এরপর ২০১৭ সালে ২৭৫ মেগাওয়াট উৎপাদন ক্ষমতা সম্পন্ন আরেকটি ইউনিট চালু করে এই বিদ্যুৎকেন্দ্রের মোট উৎপাদন ক্ষমতা বেড়ে দাঁড়ায় ৫২৫ মেগাওয়াট। কিন্তু যান্ত্রিক ত্রুটিসহ নানা জটিলতায় কখনই এই বিদ্যুৎকেন্দ্রটি একসঙ্গে ৫২৫ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে পারেনি।
বড়পুকুরিয়া তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রের তিনটি ইউনিটের মধ্যে ২৭৫ মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন তৃতীয় ইউনিট যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে ২০২৪ সালের ১ নভেম্বর থেকে বন্ধ। ১২৫ মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন দ্বিতীয় ইউনিট ২০২০ সালের নভেম্বর থেকে বন্ধ। গত বছরের ৩০ ডিসেম্বর ১২৫ মেগাওয়াট উৎপাদন ক্ষমতাসম্পন্ন প্রথম ইউনিটটি বন্ধ হয়ে যায়। পরে ১৫ দিন পর উৎপাদনে আসে ১৪ জানুয়ারি। বেশ কয়েক মাস ঢিমেতালে চলার পর গত ২২ এপ্রিল রাত ১০টা ১০ মিনিটে আবার ইউনিটটি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বর্তমানে পুরোপুরি বন্ধ রয়েছে বড়পুকুরিয়া তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রের উৎপাদন।
এদিকে জাতীয় গ্রিড থেকে বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হলেও উত্তরাঞ্চলে চাহিদা পূরণে বড়পুকুরিয়া তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকে। একদিকে বিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধ, অন্যদিকে সরবরাহে ঘাটতি। এতে মারাত্মক ভোগান্তিতে পড়েছেন উত্তরাঞ্চলের মানুষ। জাতীয় গ্রিড থেকেও মিলছে না চাহিদামাফিক বিদ্যুৎ। এক সপ্তাহ ধরে বেড়েছে ভ্যাপসা গরম। ৩৫ থেকে ৩৭ ডিগ্রি সেলসিয়াসে পুড়ছে অঞ্চলটি। এই গরমে সেখানে বেড়েছে বিদ্যুৎ বিভ্রাট। সকাল, ভোর কিংবা গভীর রাতে চলছে এই বিদ্যুৎ বিভ্রাট।
দেশজুড়ে বয়ে চলা দাবদাহের মধ্যে সাধারণ মানুষের জন্য আরও অস্বস্তির খবর জানালো বিদ্যুৎ বিভাগ। জ্বালানি স্বল্পতার কারণে বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও তা কাজে লাগানো যাচ্ছে না, যার ফলে গতকাল বৃহস্পতিবার সারা দেশে প্রায় ৩ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুতের ঘাটতি বা লোডশেডিং হতে পারে। বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের সভাকক্ষে আয়োজিত এক জরুরি সংবাদ সম্মেলনে বিদ্যুৎ বিভাগের পক্ষ থেকে এই তথ্য নিশ্চিত করা হয়েছে।
চাহিদা ও উৎপাদনের ব্যবধান : সংবাদ সম্মেলনে বিদ্যুৎ বিভাগের যুগ্ম সচিব উম্মে রেহানা জানান, দেশের সর্বোচ্চ বিদ্যুতের চাহিদা ধরা হয়েছে ১৭ হাজার মেগাওয়াট। এর বিপরীতে উৎপাদন হতে পারে মাত্র ১৪ হাজার মেগাওয়াট। ফলে ৩ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুতের যে ঘাটতি তৈরি হবে, তা পূরণে এলাকাভিত্তিক লোডশেডিং ছাড়া আর কোনো বিকল্প নেই। এর আগে গত বুধবারও পরিস্থিতির কোনো উন্নতি ছিল না। বুধবার ১৫ হাজার ৭৬৭ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে সরবরাহ ছিল ১৩ হাজার ৬৮১ মেগাওয়াট। অর্থাৎ গতকালও দেশবাসীকে ২ হাজার ৮৬ মেগাওয়াট লোডশেডিংয়ের কবলে পড়তে হয়েছিল।
উৎপাদন সংকটের মূলে গ্যাসের অভাব : বিদ্যুৎ বিভাগের তথ্যমতে, দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদনের অবকাঠামোগত সক্ষমতা থাকলেও কেবল গ্যাসের অভাবে অর্ধেকের বেশি গ্যাসচালিত কেন্দ্র বন্ধ বা সীমিত পরিসরে চলছে।
সক্ষমতা বনাম উৎপাদন: গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর উৎপাদনক্ষমতা ১২ হাজার ১৫৪ মেগাওয়াট হলেও গতকাল উৎপাদন করা গেছে মাত্র ৫ হাজার ২৭৪ মেগাওয়াট। গ্যাসের সরবরাহ: সক্ষমতা অনুযায়ী উৎপাদনের জন্য দিনে ২০০ কোটি ঘনফুট গ্যাস প্রয়োজন। অন্তত ১২০ কোটি ঘনফুট সরবরাহ থাকলেও ৭ হাজার ২০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ পাওয়া সম্ভব ছিল। কিন্তু বর্তমানে সরবরাহ করা হচ্ছে মাত্র ৮৫ থেকে ৯০ কোটি ঘনফুট।
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি সরবরাহ চেইন ব্যাহত হওয়াকেও এই সংকটের অন্যতম কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। এছাড়া উৎপাদন খরচ সাশ্রয়ের লক্ষ্যে সরকার ব্যয়বহুল ফার্নেস অয়েল ও ডিজেলচালিত কেন্দ্রগুলোর ব্যবহার কমিয়ে দিয়েছে।
বড় বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর কারিগরি বিপর্যয় : গ্যাস সংকটের পাশাপাশি বড় কয়েকটি কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের যান্ত্রিক ত্রুটি পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।
১. আদানি পাওয়ার প্ল্যান্ট: কারিগরি ত্রুটির কারণে ভারতের আদানির একটি ইউনিট বর্তমানে বন্ধ রয়েছে। তবে আশা করা হচ্ছে ২৬ এপ্রিল এটি পুনরায় উৎপাদনে ফিরবে।
২. এসএস পাওয়ার (বাঁশখালী): বাঁশখালীর এই কেন্দ্রের একটি ইউনিটে বিদ্যুৎ-বিভ্রাটের কারণে জাতীয় গ্রিডে ৬৫০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ কম আসছে। এটি ২৮ এপ্রিল নাগাদ সচল হতে পারে। তবে বিদ্যুৎ বিভাগ একটি ইতিবাচক বার্তা দিয়ে জানিয়েছে যে, আগামী মে মাসের প্রথম সপ্তাহের মধ্যে প্রায় ১ হাজার ৯৮২ মেগাওয়াট বাড়তি বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হতে পারে, যা গ্রীষ্মের লোডশেডিং কমাতে সহায়ক হবে।
লোডশেডিং ব্যবস্থাপনা ও অগ্রাধিকার : সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, ক্রমবর্ধমান গরম এবং নতুন নতুন শিল্পাঞ্চল গড়ে ওঠার ফলে বিদ্যুতের চাহিদা আগের চেয়ে অনেক বেড়েছে। বর্তমান পরিস্থিতিতে গ্রাম ও শহরের মধ্যে লোডশেডিংয়ের ভারসাম্য বজায় রাখার নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। বিশেষ করে চলমান সেচ মৌসুমে কৃষকদের যেন সমস্যা না হয়, সেদিকে নজর দিতে বলা হয়েছে।
তবে বিতর্কের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে লোডশেডিংয়ের বৈষম্য। বিদ্যুৎ বিভাগ জানিয়েছে, ঢাকা শহরকে আপাতত লোডশেডিংমুক্ত রাখার চেষ্টা করা হচ্ছে। এর ফলে ঢাকার বাইরের জেলাগুলোতে, বিশেষ করে গ্রামীণ জনপদে লোডশেডিংয়ের মাত্রা অনেক বেশি অনুভূত হচ্ছে।
বিদ্যুৎ বিভাগের ভাষ্যমতে, অবকাঠামো থাকলেও জ্বালানির অভাবে দেশ আজ অন্ধকারের পথে। আন্তর্জাতিক বাজারের অস্থিরতা আর অভ্যন্তরীণ গ্যাস সংকটের জোড়া ধাক্কায় বিপর্যস্ত বিদ্যুৎ খাত। মে মাসের শুরুতে নতুন উৎপাদন যুক্ত হওয়ার যে আশ্বাস দেয়া হয়েছে, সাধারণ মানুষ এখন সেই দিনের অপেক্ষায় প্রহর গুনছে। তবে আপাতত এই তপ্ত গরমে ৩ হাজার মেগাওয়াটের ঘাটতি দেশবাসীর ধৈর্য ও সহনশীলতার বড় পরীক্ষা নেবে।








