সেপ্টেম্বর ২৩, ২০২৬ ৮:৩৩ পূর্বাহ্ণ

বাড়ছে ব্যয়, কমছে আয়; সংসার চালাতে হিমশিম

Facebook
Twitter
LinkedIn
WhatsApp
Print

নিজস্ব প্রতিবেদক,অমৃতালোক :

একদিকে মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়ছে, অন্যদিকে কমছে আয়। জ্বালানি তেলের দাম লিটারে ২০ টাকা বৃদ্ধির জেরে বেড়েছে নিত্যপণ্যের দাম ও পরিবহন ভাড়া। অতিরিক্ত বা ভূতুড়ে বিদ্যুৎ বিল আসার কারণে সাধারণ গ্রাহকদের ‘মড়ার ওপর খাঁড়ার ঘা’ অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। পাইপলাইনে গ্যাস সংকটের কারণে দেশের বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে অনেক কারখানা সচল রাখতে সিএনজি সিলিন্ডারে করে গ্যাস নেওয়ার প্রবণতা ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। এতে খরচ বৃদ্ধির পাশাপাশি নিরাপত্তা ঝুঁকিও বেড়েছে। অন্যদিকে গ্যাসসহ নানা সংকটে একে একে বন্ধ হচ্ছে ছোট ছোট উৎপাদনমুখী শিল্পপ্রতিষ্ঠান। এতে বাড়ছে বেকারত্ব। কাজের বাজারও মন্দা। নেই নতুন কর্মসংস্থান। পাল্লা দিয়ে বেড়েছে চিকিৎসা ও শিক্ষা ব্যয়। সব মিলিয়ে অনেক সাধারণ মানুষ সংসার চালাতে হিমশিম খাচ্ছেন।

রবিবার রাতে জ্বালানি তেলের দাম লিটারে ২০ টাকা করে বাড়ায় সমাজের সব শ্রেণি-পেশার মানুষের ওপর বাড়তি খরচের বোঝা চেপে বসেছে। বিশেষ করে সীমিত আয়ের মানুষসহ যাদের হাতে আয় বাড়ানোর ক্ষমতা নেই, তাদের যাপিত জীবন একরকম বিষিয়ে উঠছে। একসময় আর্থিক সংকট কাটাতে মানুষ গ্রাম থেকে শহরে আসতেন। সময়ের পরিক্রমায় পালটে যাচ্ছে সেই চিরচেনা দৃশ্যপট। সরকারি পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, আয়ের তুলনায় ব্যয় বেশি হওয়ায় গত পাঁচ বছর ধরে গ্রামে ফিরে আসা মানুষের সংখ্যা প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। জানা গেছে, সরবরাহ লাইনে গ্যাসের চাপ কম থাকায় উৎপাদন সচল রাখতে সিএনজি ফিলিং স্টেশন থেকে সিলিন্ডারে ভরে গ্যাস নেন তৈরি পোশাক ও বস্ত্র, সিরামিকসহ বিভিন্ন খাতের অনেক শিল্পকারখানার মালিকরা। এভাবে অনিরাপদ সিলিন্ডারে গ্যাস পরিবহন গ্যাস আইন-২০১০ ও গ্যাস বিতরণ বিধিমালা-২০১৬ অনুযায়ী নিষিদ্ধ। তবে বিষয়টি অনেক দিন ধরে প্রকাশ্যেই চলছে। সাম্প্রতিক গ্যাস-সংকটে এ প্রবণতা বৃদ্ধি পায়।

এদিকে জ্বালানি তেলের দাম বাড়লেই বাসভাড়া বাড়ানোর দাবি ওঠে, কখনো কখনো ভাড়া বাড়েও। এটিই দেশের গণপরিবহনে বিশেষ করে বাসের ক্ষেত্রে যেন নিয়মিত চিত্র। এবারও এর ব্যতিক্রম হয়নি। ২০ সেপ্টেম্বর রাতে ডিজেল, কেরোসিন, পেট্রোল ও অকটেনের দাম লিটারপ্রতি ২০ টাকা বাড়িয়েছে সরকার। দাম বাড়ানোর সঙ্গে সঙ্গেই দাবি উঠেছে গণপরিবহনে ভাড়া বাড়ানোর। আবার সরকার বাসভাড়া বাড়ানোর ঘোষণা না দিলেও এরই মধ্যে কোথাও কোথাও বাড়তি ভাড়া আদায় করা হচ্ছে। ডেমরার স্টাফ কোয়ার্টার থেকে মিরপুর-১০ এ চলাচল করে আলিফ পরিবহন। সোমবার সন্ধ্যায় এই রুটের যাত্রীদের কাছ থেকে ১০ টাকা করে বেশি ভাড়া নিতে দেখা গেছে। নারায়ণগঞ্জের সাইনবোর্ড থেকে ঢাকার উত্তরা (আব্দুল্লাহপুর) রুটে চলাচল করে ইকবাল এন্টারপ্রাইজের এসি বাস। এ বাসে সোমবার থেকে ভাড়া ১০ থেকে ২০ টাকা বেড়েছে। অর্থাত্, বাড্ডা লিংক রোড কাউন্টার থেকে উত্তরা পর্যন্ত আগে ৯০ টাকা ভাড়া ছিল, কিন্তু সোমবার থেকে ১১০ টাকা করে নিতে দেখা গেছে। যদিও বিআরটিএ এসি বাসের ভাড়া নির্ধারণ করে দেয় না।

এসি বাসের মালিকরাই নিজেদের মতো ভাড়া বাড়িয়ে নিচ্ছেন। উত্তরা হাউজ বিল্ডিংয়ে ইকবাল পরিবহনের টিকিট বিক্রি করেন শাকিব। তিনি জানান, তার কোম্পানি সোমবার সব গন্তব্যে ২০ টাকা করে ভাড়া বাড়ানোর নির্দেশনা দিয়েছে। শুধু নতুন বাজার থেকে উত্তরা বা সাইনবোর্ড পর্যন্ত ১০ টাকা করে ভাড়া বাড়ানো হয়েছে। সে অনুযায়ী আমরা যাত্রীদের থেকে ভাড়া বেশি নিচ্ছি।

অর্থনীতিবিদরা বলেন, জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির বিরূপ প্রভাব শুধু সাধারণ মানুষের ওপর পড়ছে না, শিল্পপতির শিল্প পরিচালনার উৎপাদন খরচও বাড়বে বহুগুণ। বাড়ছে গণপরিবহনসহ সব ধরনের পরিবহন ভাড়া। নিত্যপণের বাজার তো এ অজুহাতে সোমবার থেকেই গরম। কৃষকের সেচ খরচও নির্ঘাত বাড়ছে। এই যখন অবস্থা, বাড়িভাড়া বাড়াতেও বাড়িওয়ালারা বেশি সময় নেবেন না। এককথায় বলা যায়, ধনী থেকে দরিদ্র-সবার জীবনে কমবেশি এর বিরূপ প্রভাব পড়বে। অর্থনীতিবিদ ও ব্যবসায়ীরা বলছেন, এটি মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয়ে বড় ধাক্কা। এর ফলে একদিকে মূল্যস্ফীতি বাড়বে, অপরদিকে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা আরো কমে যাবে। এককথায়, সামগ্রিকভাবে অর্থনীতি নানামুখী চাপে পড়বে। সরকারের এই সিদ্ধান্ত অর্থনীতিকে আরো বাধাগ্রস্ত করবে। তবে তাদের মতে, মূল্য না বাড়িয়ে তেমন কোনো বিকল্পও ছিল না।

সবজির দাম কেজিতে সাত টাকা বৃদ্ধি, সরবরাহ বন্ধ ভোজ্য তেলের :তেলের মূল্য বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে রাজধানীর খুচরা বাজারে বেশ কয়েকটি সবজির দাম কেজিতে সাত টাকা বাড়ানো হয়েছে। বেশির ভাগ সবজির দাম ৮০ টাকার ওপরে বিক্রি হচ্ছে। কিছু সবজির দাম ১০০ টাকা ছাড়িয়েছে। পাশাপাশি জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে ভোজ্য তেলের দাম বাড়ানোর পাঁয়তারা করছে কোম্পানিগুলো। সরবরাহ একেবারেই বন্ধ করে দিয়েছে।

বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ ও ঋণপ্রবাহ সর্বনিম্নে :বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ ও ঋণপ্রবাহ সর্বনিম্নে পৌঁছেছে। এতে নতুন কর্মসংস্থান যেমন হচ্ছে না, তেমনই বিদ্যমান কর্মীও ধরে রাখা সম্ভব হচ্ছে না। এতে আয় কমার পাশাপাশি বেকারত্বও বাড়ছে, যা মানুষের জীবনযাত্রাকে আরো নিম্নমুখী ও কঠিন করে তুলছে। এ অবস্থায় জ্বালানি তেলের মূল্য বৃদ্ধি তাদের আরো বিপাকে ফেলেছে। তেলের মূল্য বৃদ্ধি পাওয়ায় আমদানি ব্যয়ও বেড়েছে। পাশাপাশি জাহাজ ভাড়া বেড়েছে।

প্রভাব পড়ছে দেশের কৃষি খাতে :তেলের মূল্য বৃদ্ধির কারণে সবচেয়ে প্রভাব পড়ছে দেশের কৃষি খাতে। বিশেষ করে ডিজেলচালিত সেচ পাম্প সংশ্লিষ্ট কৃষি ব্লক বা প্রকল্প প্রয়োজনীয় সেচের অভাবে যেমন ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, তেমনই এখন দাম বাড়ায় কৃষকের মাথায় হাত পড়েছে। এছাড়াও জ্বালানির কারণে জেনারেটরের খরচ বেড়েছে।

বিদ্যুৎ উৎপাদন: দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদনে ক্রমেই জ্বালানি তেলের ব্যবহার বাড়ছে। ফলে বিদ্যুৎ উৎপাদনের খরচও বাড়বে। বেশকিছু তেলভিত্তিক বিদ্যুেকন্দ্র পড়ে রয়েছে। কিন্তু হঠাত্ দাম বাড়ানোয় এখন খরচও বাড়বে। অর্থনীতিবিদরা বলেন, জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোর প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়বে ডিজেলনির্ভর অর্থনৈতিক কার্যক্রমে। ডিজেল সরাসরি সাধারণ মানুষের সঙ্গে জড়িত। এটাকে গরিবের জ্বালানি বলা হয়। কৃষি, গণপরিবহন, পণ্য পরিবহনসহ অর্থনীতির প্রায় সব খাতের সঙ্গে এর ব্যবহার জড়িত। ফলে ডিজেলের দাম বাড়লে পরিবহন ব্যয় থেকে শুরু করে উৎপাদন খরচ—সব ক্ষেত্রেই এর প্রভাব পড়বে।

৫০ লাখ মানুষ চিকিৎসা করাতে গিয়ে দরিদ্র হয়ে পড়ছে : জানা গেছে, চিকিৎসা খাতে পরিস্থিতি সবচেয়ে উদ্বেগজনক। দেশে প্রতি বছর প্রায় ৫০ লাখ মানুষ চিকিৎসা করাতে গিয়ে দরিদ্র হয়ে পড়ছে। অনেকেই বাধ্য হয়ে ঋণ নিচ্ছে বা সুদের টাকায় চিকিৎসা চালাচ্ছে। পরে সেই টাকা শোধ করতে গিয়ে জমিজমা বিক্রি করার মতো কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হচ্ছে। টাকা খরচ করেও অনেক ক্ষেত্রে কাঙ্ক্ষিত চিকিৎসাসেবা মিলছে না। এতে মানুষের দুর্ভোগ আরো বাড়ছে।

শিক্ষা খরচ বেড়েছে ৬০ শতাংশ :সন্তানদের পড়াশোনার খরচ জোগাতে গিয়ে হিমশিম খাচ্ছেন অভিভাবকরা। স্কুলের বেতন, কোচিং, প্রাইভেট টিউটর, বই—সব মিলিয়ে খরচ বেড়েছে ৬০-৯০ শতাংশ পর্যন্ত। বিশেষ করে মাধ্যমিক পর্যায়ে এই চাপ আরো বেশি। ফলে অনেক দরিদ্র পরিবারই বাধ্য হয়ে সন্তানদের পড়াশোনা বন্ধ করে দিচ্ছে। বেসরকারি এক গবেষণা বলছে, বর্তমানে প্রায় অর্ধেক শিক্ষার্থী কোনো না কোনো পর্যায়ে ঝরে পড়ছে, যার বড় কারণ দারিদ্র্য। ইউনেসকোর তথ্য অনুযায়ী, শিক্ষার পেছনে গড় খরচ বেড়েছে প্রায় ৮০ শতাংশ। এমনকি দেশের প্রায় ৭ শতাংশ পরিবার সন্তানদের স্কুলে পাঠাতে ঋণ নিতে বাধ্য হচ্ছে।

এদিকে বাসাভাড়া, যাতায়াত খরচ ও নিত্যদিনের অন্যান্য ব্যয়ও বেড়েছে। বিশেষ করে বেসরকারি চাকরিজীবীরা সবচেয়ে বেশি বিপাকে আছেন। তাদের বেতন খুব একটা বাড়ছে না, অথচ প্রতি মাসেই খরচের চাপ বাড়ছে। ফলে সংসার চালাতে গিয়ে অনেকেই সঞ্চয় ভাঙছেন, কেউ আবার ধারদেনার ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ছেন। এদিকে সম্প্রতি নবম জাতীয় পে-স্কেলের গেজেট প্রকাশ করা হয়েছে। তিন ধাপে এটা বাস্তবায়ন হবে। চলতি ১ জুলাই থেকে ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত নবম ও তদূর্ধ্ব গ্রেডের কর্মকর্তারা নতুন কাঠামোয় নির্ধারিত বাড়তি মূল বেতনের ৪০ শতাংশ পাবেন। একই সময়ে ১০ম থেকে ২০তম গ্রেডের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা বাড়তি মূল বেতনের ৫০ শতাংশ পাবেন। সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের এই বেতন বৃদ্ধির প্রভাবও বাজারে পড়বে।

নিউজটি ‍শেয়ার করতে নিচের বাটনগুলোতে চাপ দিন

আরো খবর

বিভাগীয় সংবাদ