অক্টোবর ১২, ২০২৬ ৮:০৭ পূর্বাহ্ণ

দেশীয় গ্যাস সরবরাহ কমেছে ৩৪%, এলএনজি বেড়েছে ৪৩%

Facebook
Twitter
LinkedIn
WhatsApp
Print

নিজস্ব প্রতিবেদক, অমৃতালোক:

ধারাবাহিকভাবে দেশীয় গ্যাসের উৎপাদন কমে যাওয়ায় জ্বালানি নিরাপত্তায় বাড়ছে আমদানিনির্ভরতা। দেশে গ্যাসের চাহিদা উল্লেখযোগ্য হারে বাড়লেও ছয় বছরের ব্যবধানে জাতীয় গ্রিডে দেশীয় কূপ থেকে গ্যাসের সরবরাহ কমেছে প্রায় ৩৪ শতাংশ।

একই সঙ্গে ঘাটতি পূরণে আমদানি করা ব্যয়বহুল তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) সরবরাহ বেড়েছে প্রায় ৪৩ শতাংশ। ফলে বর্তমানে জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করা মোট গ্যাসের প্রায় ৩৮ শতাংশই আসছে এলএনজি থেকে। সংশ্লিষ্টরা আশঙ্কা করছেন, দেশীয় গ্যাসের উৎপাদন উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানো না গেলে আগামী ২০৩০ সালের মধ্যে মোট গ্যাস সরবরাহে এলএনজির অংশ ৬০ থেকে ৭০ শতাংশে পৌঁছতে পারে। তখন উচ্চমূল্যের এলএনজি আমদানির ব্যয় সামাল দেওয়া কঠিন হয়ে পড়বে।

এতে বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ, বিদ্যুৎ উৎপাদনে ব্যয় বৃদ্ধি এবং শিল্প খাতের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা কমে যাওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।
পেট্রোবাংলার গ্যাস সরবরাহের তথ্য পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, ২০২০ সালের ১ অক্টোবর দেশীয় কূপগুলো থেকে দৈনিক দুই হাজার ৪৪৭ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ হলেও চলতি বছরের ১ অক্টোবর তা কমে দাঁড়িয়েছে এক হাজার ৬২০ মিলিয়ন ঘনফুটে। বিপরীতে ৭০২ মিলিয়ন ঘনফুট থেকে বেড়ে এলএনজি সরবরাহ হয়েছে এক হাজার তিন মিলিয়ন ঘনফুট। ফলে ছয় বছরের ব্যবধানে এলএনজির সরবরাহ প্রায় ৪৩ শতাংশ বেড়েছে।

এতে একদিকে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর চাপ বাড়ছে, অন্যদিকে সরকারের ভর্তুকির বোঝাও ক্রমে ভারী হচ্ছে।
পেট্রোবাংলার তথ্য অনুযায়ী, ২০২০ সালের ১ অক্টোবর জাতীয় গ্রিডে দৈনিক মোট গ্যাস সরবরাহ ছিল তিন হাজার ১৪৮ মিলিয়ন ঘনফুট। ২০২৬ সালের ১ অক্টোবর জাতীয় গ্রিডে মোট সরবরাহ কমে দাঁড়িয়েছে দুই হাজার ৬২৩ মিলিয়ন ঘনফুটে। গ্যাস সরবরাহের তথ্য বলছে, ২০২১ সালের ১ অক্টোবর জাতীয় গ্রিডে মোট গ্যাস সরবরাহ ছিল তিন হাজার ২৩০ মিলিয়ন ঘনফুট। এর মধ্যে দেশীয় গ্যাস দুই হাজার ৩৩৬ মিলিয়ন ঘনফুট এবং এলএনজি ৮৯৪ মিলিয়ন ঘনফুট।

২০২২ সালের ১ অক্টোবর জাতীয় গ্রিডে মোট গ্যাস সরবরাহ ছিল দুই হাজার ৭৫৮ মিলিয়ন ঘনফুট। এর মধ্যে দেশীয় গ্যাসের সরবরাহ ছিল দুই হাজার ২৭৪ এবং এলএনজি ৪৮৪ মিলিয়ন ঘনফুট। ২০২৩ সালের ১ অক্টোবর জাতীয় গ্রিডে মোট দুই হাজার ৯০২ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা হয়। তার মধ্যে দেশীয় গ্যাস দুই হাজার ১০৬ এবং এলএনজি ৭৯৬ মিলিয়ন ঘনফুট। ২০২৪ সালের ১ অক্টোবর জাতীয় গ্রিডে মোট গ্যাস সরবরাহ ছিল দুই হাজার ৫৩২ মিলিয়ন ঘনফুট। এর মধ্যে দেশীয় গ্যাস দুই হাজার দুই এবং এলএনজি ৫৩০ মিলিয়ন ঘনফুট সরবরাহ করা হয়। ২০২৫ সালের ১ অক্টোবর জাতীয় গ্রিডে মোট গ্যাস সরবরাহের পরিমাণ ছিল দুই হাজার ৭৫৩ মিলিয়ন ঘনফুট। তার মধ্যে দেশীয় গ্যাস এক হাজার ৭৮৪ মিলিয়ন ঘনফুট এবং এলএনজি সরবরাহ ছিল ৯৬৯ মিলিয়ন ঘনফুট। ২০২৬ সালের ১ অক্টোবর জাতীয় গ্রিডে মোট গ্যাস সরবরাহ ছিল দুই হাজার ৬২৩ মিলিয়ন ঘনফুট। এর মধ্যে দেশীয় গ্যাস এক হাজার ৬২০ মিলিয়ন ঘনফুট এবং এলএনজি ১০০৩ মিলিয়ন ঘনফুট।
দেশীয় গ্যাসের উৎপাদন কমে যাওয়ার পাশাপাশি দেশে গ্যাসের চাহিদাও বাড়ছে। বর্তমানে দৈনিক গ্যাসের চাহিদা চার হাজার মিলিয়ন ঘনফুটের বেশি। কিন্তু গত মঙ্গলবার জাতীয় গ্রিডে এলএনজিসহ মোট সরবরাহ করা হয়েছে দুই হাজার ৫৭৬ মিলিয়ন ঘনফুট। চাহিদা ও সরবরাহে ঘাটতি ছিল এক হাজার ৪০০ মিলিয়ন ঘনফুটের বেশি। বিপুল অর্থ ব্যয় করে এলএনজি আমদানি করেও এই ঘাটতি পূরণ করা যাচ্ছে না।

এলএনজিতে বাড়ছে ব্যয়

দেশীয় গ্যাসের উৎপাদন কমে যাওয়ার প্রভাব পড়ছে এলএনজি আমদানিতে। পেট্রোবাংলার তথ্য অনুযায়ী, ২০১৮-১৯ থেকে ২০২৫-২৬ অর্থবছর পর্যন্ত আট অর্থবছরে এলএনজি আমদানিতে ব্যয় হয়েছে প্রায় দুই লাখ ৭৭ হাজার ৪৫২ কোটি টাকা। একই সময়ে সরকারকে এলএনজিতে ভর্তুকি দিতে হয়েছে ৫১ হাজার ৩৬৬ কোটি টাকা।

এদিকে বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে এলএনজির দামও বেড়েছে। চলতি বছরের শুরুতে প্রতি এমএমবিটিইউ এলএনজি ১০ থেকে ১২ ডলারে কেনা হলেও সেপ্টেম্বরে তা বেড়ে প্রায় ৩০ ডলারে উঠেছে। অর্থাৎ কয়েক মাসের ব্যবধানে দাম বেড়েছে প্রায় তিন গুণ। কাতার থেকে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির আওতায় এলএনজি সরবরাহ বন্ধ থাকায় স্পট মার্কেটের ওপর বাংলাদেশের নির্ভরতা বেড়েছে। এতে চলতি অর্থবছরের প্রথম আড়াই মাসেই এলএনজি খাতে ভর্তুকি দিতে হয়েছে ১০ হাজার ৩০০ কোটি টাকা। অথচ পুরো বছরের জন্য বরাদ্দ ছিল সাড়ে ছয় হাজার কোটি টাকা। এর বাইরে গত সাড়ে ছয় মাসে নির্ধারিত ভর্তুকির বাইরে পেট্রোবাংলার অতিরিক্ত ব্যয় হয়েছে আরো ১৭ হাজার ৪০০ কোটি টাকা।

পেট্রোবাংলার পরিচালক (অর্থ) এ কে এম মিজানুর রহমান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘যুদ্ধের প্রভাবে গত সাড়ে ছয় মাসে নির্ধারিত ভর্তুকির বাইরে অতিরিক্ত ১৭ হাজার ৪০০ কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে। এ ছাড়া গত আড়াই মাসে এলএনজির জন্য প্রায় ১০ হাজার ৩০০ কোটি টাকা ভর্তুকি পাওয়া গেছে।’

জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এলএনজি আমদানিতে বিপুল বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয়ের কারণে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর চাপ তৈরি হচ্ছে। একই সঙ্গে বিদ্যুৎ উৎপাদন ও শিল্প খাতে গ্যাস সরবরাহ অব্যাহত রাখতে সরকারকে বড় অঙ্কের ভর্তুকি দিতে হচ্ছে। আন্তর্জাতিক বাজারে এলএনজির দাম বাড়লে এই চাপ আরো তীব্র হয়।

জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ও ইনডিপেনডেন্ট ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশের (আইইউবি) উপাচার্য অধ্যাপক ম. তামিম কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘এলএনজি আমদানির পেছনে যে বিপুল অর্থ ব্যয় করা হয়েছে, তার মাত্র ১০ ভাগের এক ভাগ যদি দেশে তেল-গ্যাস অনুসন্ধান ও নতুন কূপ খননে বিনিয়োগ করা হতো, তাহলে আজ এত বেশি আমদানিনির্ভর হতে হতো না।’

তিনি বলেন, ‘দেশীয় গ্যাসক্ষেত্রের সম্ভাবনা কাজে লাগানোর পরিবর্তে দীর্ঘদিন ধরে আমদানিনির্ভরতার ওপর বেশি গুরুত্ব দেওয়ায় জ্বালানি খাতে ব্যয় ক্রমাগত বেড়েছে। এখন এলএনজি আমদানিতে যে অর্থ ব্যয় হচ্ছে, তার একটি অংশও যদি অনুসন্ধান, আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার এবং নতুন গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কারে বিনিয়োগ করা হতো, তাহলে দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা আরো শক্তিশালী হতো।’

অধ্যাপক ম. তামিম আরো বলেন, ‘দেশের গ্যাসক্ষেত্রগুলো এখন ক্রমহ্রাসমান (ডিক্লাইনিং) পর্যায়ে রয়েছে। এসব গ্যাসক্ষেত্র থেকে উৎপাদন ধরে রাখতে প্রয়োজন উন্নত প্রযুক্তি, অভিজ্ঞতা ও বড় বিনিয়োগ, যা বাপেক্সের পর্যাপ্ত নেই। তাই শুধু বাপেক্সের ওপর নির্ভর না করে শেভরনের মতো অভিজ্ঞ আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের প্রযুক্তি, জ্ঞান ও বিনিয়োগ কাজে লাগানোর বিষয়টি বিবেচনা করা উচিত।’

১৫০ কূপ খননের উদ্যোগ

দেশীয় গ্যাসের উৎপাদন বাড়াতে সরকার ১৫০টি কূপ খনন ও ওয়ার্কওভার কর্মসূচি বাস্তবায়ন করছে। পরিকল্পনাটি বাস্তবায়িত হলে ২০৩০ সালের মধ্যে দৈনিক প্রায় এক হাজার ৪০১ মিলিয়ন ঘনফুট অতিরিক্ত গ্যাস উৎপাদনের আশা করছে পেট্রোবাংলা। এতে আমদানি করা তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) নির্ভরতা কমার পাশাপাশি বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ কমবে।

পেট্রোবাংলার হালনাগাদ তথ্য অনুযায়ী, দেশে এ পর্যন্ত ২৯.৭৮ ট্রিলিয়ন ঘনফুট (টিসিএফ) উত্তোলনযোগ্য গ্যাসের মজুদ মূল্যায়ন করা হয়েছে। এর মধ্যে গত ৩০ জুন পর্যন্ত প্রায় ২২.৪১ টিসিএফ গ্যাস উত্তোলন করা হয়েছে। অবশিষ্ট উত্তোলনযোগ্য গ্যাসের পরিমাণ প্রায় ৭.৩৭ টিসিএফ। বিদ্যমান গ্যাসক্ষেত্রগুলোর উৎপাদন ক্রমাগত কমে আসায় ভবিষ্যতে দেশীয় গ্যাস সরবরাহের ওপর চাপ আরো বাড়তে পারে। এ অবস্থায় নতুন গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কার, পুরনো ক্ষেত্রের গভীর স্তরে অনুসন্ধান এবং দ্রুত উন্নয়নকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

পেট্রোবাংলার পরিচালক (অপারেশন অ্যান্ড মাইনস) প্রকৌশলী মো. শোয়েব কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘দেশীয় গ্যাসের উৎপাদন বাড়াতে সরকার ১৫০টি কূপ খনন ও ওয়ার্কওভার কর্মসূচি বাস্তবায়নের পাশাপাশি নতুন গ্যাসের সন্ধানে ব্যাপক অনুসন্ধান কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। দেশের বিভিন্ন গ্যাসক্ষেত্র ও ব্লকে সাইসমিক ডেটা সংগ্রহ, প্রক্রিয়াকরণ ও বিশ্লেষণের মাধ্যমে নতুন লিড ও খননযোগ্য প্রসপেক্ট শনাক্ত করা হচ্ছে।’

সমুদ্রে তেল-গ্যাস অনুসন্ধান

বঙ্গোপসাগরে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানে বাংলাদেশের ডাকা আন্তর্জাতিক দরপত্রে বিদেশি বহুজাতিক কম্পানিগুলোর আগ্রহ বাড়ছে। এরই মধ্যে দশটি আন্তর্জাতিক কম্পানি পেট্রোবাংলার কাছ থেকে তথ্য প্যাকেজ কিনেছে। পাশাপাশি তুরস্কের রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান টার্কিশ পেট্রোলিয়াম ওভারসিজ কম্পানি (টিপিএও)সহ কয়েকটি কম্পানিও দরপত্রের নথি কিনে আনুষ্ঠানিকভাবে অংশগ্রহণের প্রস্তুতি নিয়েছে। এ ছাড়া আরো কয়েকটি আন্তর্জাতিক কম্পানি পেট্রোবাংলার সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখছে। বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আকৃষ্ট করতে এবার উৎপাদন অংশীদারিত্ব চুক্তি (পিএসসি) সংশোধন করে আগের তুলনায় আর্থিক ও বাণিজ্যিক সুবিধা বাড়ানো হয়েছে। ফলে এবার বিপুলসংখ্যক বিদেশি কম্পানি দরপত্রে অংশ নেবেন বলে সংশ্লিষ্টদের আশা।

জানা গেছে, গত ২৪ মে পেট্রোবাংলা ‘অফশোর বিডিং রাউন্ড-২০২৬’-এর আন্তর্জাতিক দরপত্র আহবান করা হয়। এতে গভীর ও অগভীর সমুদ্র মিলিয়ে মোট ২৬টি ব্লক তেল-গ্যাস অনুসন্ধানের জন্য উন্মুক্ত করা হয়েছে। দরপত্র জমা দেওয়ার শেষ সময় আগামী ৩০ নভেম্বর।

পেট্রোবাংলার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা বলছেন, দেশে ২০১৮ সালে প্রথমবারের মতো বাণিজ্যিকভাবে এলএনজি আমদানি শুরু হয়। তখন এটি ছিল দেশীয় গ্যাসের ঘাটতি পূরণের একটি পরিপূরক ব্যবস্থা। কিন্তু মাত্র কয়েক বছরের ব্যবধানে সেটিই এখন জাতীয় জ্বালানি ব্যবস্থার অন্যতম প্রধান ভরসায় পরিণত হয়েছে। উৎপাদন কমতে থাকায় প্রতিবছর বাড়ছে এলএনজি আমদানির পরিমাণ, সেই সঙ্গে বাড়ছে সরকারের ভর্তুকির বোঝাও।

নিউজটি ‍শেয়ার করতে নিচের বাটনগুলোতে চাপ দিন

আরো খবর

বিভাগীয় সংবাদ