নিউজ ডেস্ক,অমৃতালোক :
“এই শহরে পাখিদের ঘুম ভাঙ্গে গুলির শব্দে এই শহরে ছাত্র পড়ে থাকে মগজ ভর্তি বারুদের গন্ধে।”
কারফিউয়ের মধ্যে আতঙ্কিত ঢাকার হাসপাতাল মর্গে উপচেপড়া লাশ আর আহতের ভিড়। বারুদের গন্ধভরা সেই জুলাইকে এভাবেই বয়ান করেছিলেন ‘ঋষি কাব্য’ নামে পরিচিতি পাওয়া কাজী আশরাফ আহমেদ রিয়াজ।
২৯ জুলাই ফেইসবুকে কবিতাটি পোস্ট করার দুদিনের মাথায় মোহাম্মদপুরের বসিলার ভাড়া বাসায় তার লাশ পাওয়া যায়। কীভাবে ঋষি কাব্যর মৃত্যু হল, সেই রহস্য এখনো অজানা।
২০২৪ সালের জুলাইয়ে এসে সারা বাংলাদেশ দাবানলের মত ছড়িয়ে পড়া কোটা সংস্কারের আন্দোলনটি বলতে গেলে এক দশকের বেশি সময় ধরে চলে আসছিল। তবে ২০১৮ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে কেন্দ্র করে এই আন্দোলন গতি পায়।
এ বিষয়ে হাই কোর্টে একটি মামলা ঘিরে ২০২৪ সালের জুন মাসে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে এই আন্দোলন নতুন মাত্রা পায়, জুলাইয়ে তা ছড়িয়ে পড়তে শুরু করে দেশের অন্যান্য স্থানে।
মাঝ জুলাইয়ের এক সংবাদ সম্মেলনে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার এক মন্তব্য আন্দোলনকে আরও উসকে দেয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শুরু হওয়া এই আন্দোলন একটা পর্যায়ে টেনে নিয়ে যায় বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়ারা।
ছাত্রদের লক্ষ্য করে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর নির্বিচার গুলির মুখে এই আন্দোলনে যুক্ত হন বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের কর্মী, মাদ্রাসার ছাত্র-শিক্ষক, শ্রমিক, এমনকি চাকরিজীবীরাও। আন্দোলন রূপ নেয় এক দফায়– শেখ হাসিনা সরকারের পদত্যাগ।
সংঘাত আর রক্তপাতের মধ্যে জুলাই পেরিয়ে আন্দোলন প্রবেশ করে অগাস্টে। তবে আন্দোলনকারীরা বলে ওঠেন, তাদের লক্ষ্য পূরণ না হওয়া পর্যন্ত জুলাই মাস শেষ হবে না। তারা গুনতে থাকেন ৩১ জুলাই, ৩২ জুলাই…।
হাজারখানেক ছাত্র-জনতার প্রাণ ঝরে যায়। আহত হন আরও কয়েক হাজার মানুষ। অবশেষে জুলাই মাস শেষ হয় ‘৩৬ দিনে’।
১৫ বছর ধরে বাংলদেশের শাসন ক্ষমতায় থাকা শেখ হাসিনা ৫ অগাস্ট দেশ ছেড়ে পালাতে বাধ্য হন। শুরু হয় শেখ হাসিনাবিহীন এক নতুন বাংলাদেশের যাত্রা।
কোটা না মেধা?
শেখ হাসিনার আমলেই সরকারি চাকরির কোটা সংস্কারের দাবি নিয়ে অন্তত তিন দফা আন্দোলনে নেমেছে শিক্ষার্থীরা। সংঘাতও হয়েছে বিস্তর। পুলিশ আর ছাত্রলীগের যৌথবাহিনীর হাতে বেদম মার খেয়েছে আন্দোলনকারীরা। মামলাও হয়েছে অনেকের নামে।
কোটা আন্দোলনের যে পথ ধরে ২০২৪ সালে ইতিহাসের বাঁকবদল ঘটে গেছে, তারও ১১ বছর ২০১৩ সালের জুলাইতে কোটা ব্যবস্থা বাতিলের দাবিতে শিক্ষার্থীদের মিছিলে প্রথমবার হামলার ঘটনা ঘটে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে।
ওই বছরের ১১ জুলাই ৩৪তম বিসিএস’র প্রিলিমিনারি পরীক্ষার ফলাফল ও কোটা ব্যবস্থা বাতিলের দাবিতে আন্দোলনে নেমে হামলার মুখে পড়ে শিক্ষার্থীরা। সেদিন তারা শাহবাগও অবরোধ করেছিলেন। পুলিশের পাশাপাশি আন্দোলনকারীদের ওপর হামলা চালায় ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীরাও। সেদিন উপাচার্যের বাসভবন, প্রক্টরের কার্যালয়সহ বেশ কিছু স্থাপনা ও যানবাহনে ভাঙচুর চালান আন্দোলনকারীরা।
এর মাঝে শিক্ষার্থীদের পক্ষ থেকে উচ্চ আদালতে মামলা হয়েছে, ছোট-খাট বিক্ষোভ হয়েছে। তবে বড় সংঘাতের ঘটনাটি ঘটে ২০১৮ সালের ৮ এপ্রিল। ওই সংঘাতের মধ্য দিয়েই সামনে আসে নুরুল হক নূরের ‘ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদ’ এর নাম।
সেদিন সরকারি চাকরির কোটা বাতিলের দাবিতে বিক্ষোভরত শিক্ষার্থীদের সঙ্গে পুলিশ ও ছাত্রলীগ কর্মীদের রাতভর সংঘাত চলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে। এরমধ্যে আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের একটি অংশ গভীর রাতে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের বাসভবনে ঢুকে ব্যপক ভাঙচুর চালায়।
সারা রাতের সংঘাতে আহত হয়ে দেড়শর বেশি আন্দোলনকারী ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসা নেন। আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের লক্ষ্য করে ছাত্রলীগ গুলি ছোড়ে বলেও অভিযোগ ওঠে।








